সেই পরির দল

আমাকে যখন প্রথম ক্যালায়ডোস্কোপ কিনে দেওয়া হয় — বয়স মনে নেই — মনে আছে, তখন জীবনে আলো-অন্ধকারের ধারণাটুকু খুব স্বচ্ছ ছিল। ভুল করে হয়ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে ফেলেছি — তারপর সে কি ফ্যাসাদ — যেদিকেই তাকাই, ঘন সবুজ নয়তো কালো। দুহাত দিয়ে চোখ কচলে কচলে তখন রং বার করতে করতে বুঝতে পারতাম সূর্যের রং ড্রয়িংখাতার মত হলুদ নয় — পরে, অনেক পরে, সায়েন্স বইতে সাত রঙের কথা পড়ে তাই একটুও অবাক লাগেনি, নিজের হাতে চোখ থেকে খুবলে বের করা রং সব, সব সেই কবে থেকে চেনা। তারপর, লাল রঙের যন্ত্রটার ছোট কাঁচে চোখ রাখার সাথে সাথে আলো নিজের খোকাসুলভ রেপ্যুটেশন হারালো চিরকালের মত। কিচ্ছু করার ছিল না। রং গুলো তো নাহয় কমন পাওয়া গেল, কিন্তু, নকশা গুলো? একটা নকশার সাথে মানিয়ে নিতে নিতে, হাত একটু ঘুরেছে কি ঘোরেনি, নতুন প্যাটার্ন! ক্যালায়ডোস্কোপ থেকে চোখ সরিয়েও সেদিন থেকে চোখ ঝলসেই রইল — কত জলের ঝাপটা পড়ল তারপর, কতবার চোখ খুচিয়ে রং ঝরানোর চেষ্টা ছোটবেলার মতই, চশমা এল, চশমা বদলালো, এখন তো আর চশমার দরকারও ফুরিয়েছে — নকশা কিন্তু বদলেই চলেছে আপন তালে। এই সেদিনও প্রাত্যহিক অন্ধকার শেষ হত ঠিক নিয়ম করে ভোরবেলা বাবা মা মর্নিংওয়াকে বেরোনোর সময় — সাদা রঙের পরিস্কার কাঁটাওয়ালা ঘড়িটা সাড়ে পাঁচটা বাজলেই ককিয়ে উঠত রোজ — সকাল টকাল হত। এই সেদিন বলতে, তাও কয়েকশো বছর আগের কথা।

কিছুক্ষণ হল আমি আমার হোটেলের নিচে এসে দাড়িয়েছি — নতুন শহরে — বেশ ঘন করে রাত জমেছে। একজন পরি আমার পাশে এসে প্রশ্ন করলে ওকে আমার ভয় করছে কিনা। তাই থেকেই ওই  ক্যালায়ডোস্কোপের গল্পটা মনে পড়ল — ওকে যদিও সেকথা বললাম না — এটাও বলছিনা যে আমিও কতজনকে এই একই প্রশ্ন করে শেষে ক্লান্ত হয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। একবার মনে হল বলি: যাকে চিনিনা তাকে আমার ভয় করে না। ভয় কেবল যাকে চিনি তাকে; যদি ভুল চিনি? কিন্তু পরি আপাতত রাস্তা থেকে আধখাওয়া সিগারেট কুড়োতে ব্যস্ত। আমি আর কথা বাড়ালাম না।

এও এক দৈনন্দিন নেশা, রোজ এক এক জায়গা থেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অন্ধকার দেখা — তারও কত নকশা, কত অবতার, কত রকম। কয়েক-রাত্তির আগে এরকম একদিন একটা কোনায় ভাঙা টুকরো গুলো নিয়ে বসেছি আর জুড়ে জুড়ে নিজেকে বানাচ্ছি কয়েক লক্ষতম বারের মত, আবার — খুব খিস্তি করছি নিজেকে — এমন সময় কে একজন শিস দিতে দিতে পাশে এসে বসল। বলল, শিস দিলে ঠাণ্ডা কম লাগে। এখানে অনেক পরিদেরই শীতকালে গরম কাপড় জোটে না। তাই ওরা গান গায়। আদর করে। তাও মরে যায় না। অনেকের হয়ত জামা জুতো টুকু ছাড়া শরীরের কিছুই নিজের নয়। ওরা আর বাথরুমেও কাঁদে না। আর যারা হয়ত অনেক রঙের নিচে অন্য লিঙ্গ, আর পাবলিক টয়লেটে গেলে আওয়াজ খায় — এরম অনেক পরির সাথেই আমার এখন আলাপ। মাঝেমাঝে মনে হয় ওদের মেরে ফেলি, মরলে হয়ত আরাম পাবে। কিন্তু কী যে হয় তারপর — আমিও শিস দিতে চেষ্টা করি, ঠোঁট পাকাই — গান গাই — সকাল টকাল হয়, আবার, কয়েকশো বছরের পর।

One thought on “সেই পরির দল

  1. পরির পাশে পরির বোন – দাঁড়িয়ে ছিল কতক্ষণ? লেখাটা কিন্তু বেড়ে হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *