মেটামরফসিস

Metamorphosis by Sambaran Das
“Metamorphosis” by Sambaran Das

 

তীব্রতম ভালোবাসার শেষে দেখেছি কোমর থেকে পা অবধি জড়িয়ে যেতে থাকে। অল্প কাঁপুনি তখনও লেগে থাকে চামড়ায়, খুলে রাখা পালক জড়িয়ে নিতে নিতে মনে হয় এবারে প্রয়োজন ফুরোবে, ক্রমশ, আচ্ছাদনের। পা দুটোকে পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, ওদের আলাদা করা যাবেনা কাল ভোর থেকে, ওরা আপ্রাণ জড়িয়ে এক হয়ে উঠবে ঠিক। ছোটো ছোটো অাঁশ ঘন হয়ে ঘিরে ধরবে ওদের, প্রথমে পায়ের কাছ থেকে, একান্ত অভিভাবকের মত জানাবে, জানাবে গাড়ির জানলার কাচ থেকে দেখা একজোড়া চোখ, সে চোখের লিঙ্গ নির্ধারণ করতে না পেরে তাকে টিটকিরি দিয়েছে শহরের রাস্তা আর দামী গাড়ির দামী পারফিউম, কিন্তু সে বলেছে, না! সে বলেছে মানুষ বলে মনে করিস না, ওই টাকা আমি ছোঁব না; জানাবে আমাদের পাশের বস্তির সুমিত্রার নাম, সুমিত্রা বারো বছর বয়সে প্রথম যৌনতা করে ওর দাদার সঙ্গে, সেই বছরই তার কয়েক মাস আগে সুমিত্রার প্রথম “শরীর খারাপ” হয়; জানাবে ওয়ারসান শায়ারের পদ্যের যুবতীদের কথা যারা প্রায় সকলেই ধর্ষিতা কখনও দেশের কাছে, কখনও বিদেশী মিলিটারির কাছে; আমার দেশের দলিত মেয়েটির কথা জানাবে যাকে উলঙ্গ করে বেধড়ক আঘাত করা হলো সেইদিন, পেচ্ছাপ গেলানো হলো হইহই করে; জানাবে দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে ঠাণ্ডা পোহাতে পোহাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো ফুটফুটে মেয়েটা, আর ঘুম থেকে উঠে বুঝেছিল মরে গিয়েছে; জানাবে আর ভয় দেখাবে আর বিদ্ধ করবে। তারপর পা বেয়ে অাঁশের স্রোত ক্রমশ উঠে আসবে কোমরে, জাপটে ধরবে বলিষ্ঠ জাওয়ানরা যেভাবে তাদের বন্দুককে জড়িয়ে ধরে, পরম ভরসা দিয়ে জানাবে যেভাবে ছোটোবেলায় আম্মা জানাত পৌরাণিক মৎসকন্যাদের কথা যারা অপরূপ সুন্দরী কিন্তু তাদের কেউ ছুঁতে পায় না; জানাবে নিরাপত্তা, জানাবে কাফকা, জানাবে মেটামরফসিস।

এরপর থেকে ঢেউখেলানো চুল হবে, টানাটানা চোখ হবে, গমের মত রঙ হবে, কিন্তু  মৈথুন অসমম্ভব হবে, এরপর থেকে চেয়ারে বসা হবে না। নিতান্ত প্লেটোনিক প্রেমালাপের সময়ও আমার অবস্থান হবে একটা জল ভর্তি বিচিত্র গন্ধের আকুয়ারিয়ামে। এরপর থেকে একটা জলজ্যান্ত দেহ বদলে যাবে। ভাগ হবে। এরপর শুধুই সাঁতার অথবা ভেসে থাকা। ডুবে যাওয়ার অধিকারটুকু থাকবে না। একদিন হাঁপিয়ে উঠব, কারণ যন্ত্রের ভুল ত্রুটি হয় মানুষের মতই, অক্সিজেনের অভাবে সেদিন ভেঙে বেরোতে হবে কাচের জার – কোনওদিন যা ভাঙতে শিখিনি আগে। তারপর পেরিয়ে যাবো, ছুটে পালাবো পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিমে, সমাজতন্ত্রে আমার বিশ্বাস ছিলো প্রিয় কমরেড, কিন্তু, কিন্তু পাঁচিলের ওই পারে আমার দুটো পা ছিলো, কোমরের ওইপারে, কমরেড! গুলি করবেন না পিছন ফিরলেই, আমি এমনিতেই এই জল থেকে ঝাঁপ দিলে মারা যাব। আমি নিরাপত্তাকে অস্বীকার করছি অক্সিজেনের লোভে, সাম্যকে ত্যাগ করছি দামী লিপস্টিকের লোভে, আর, আর ওই দুটো পায়ের লোভে। আমি মারা যাবো এই পলায়নেই, দেখে নেবেন, কমরেড, আপনার একটি গুলিও খরচা হবে না।

আজকাল প্রায়সই একটা স্বপ্ন দেখি অধোঘুমে। একটা বাড়ি, প্রায় প্রাগৈতিহাসিক তার বয়স। তার দিকে ছুটছি, ছুটেই চলেছি, কিন্তু স্পষ্ট করে জানিনা কেনো পালাচ্ছি অথবা আদৌ পালাচ্ছি কিনা; কিন্তু কেউ বলে দিয়েছেন একটা সিঁড়ির কথা, একটা দীর্ঘ সিঁড়ি যার আদলটা ইউরোপিয়ান কিন্তু মালিন্যে নিকট-আত্মীয়ের মত, বলে দিয়েছেন সেই সিঁড়ির ধাপে পরিচয় হবে আমাতে আর তোমাতে। তুমি বলবে, জনগণের উদ্দেশ্যে তোমার বার্তা? আমি তখনও হাঁপাচ্ছি। তুমি বলবে, তোমার সফরের কথা বলো, যেখান থেকে এলে, যেখানে যাচ্ছ। আমি হাঁপাচ্ছি, হাঁপাতে হাঁপাতে বলছি: কিন্তু আমার সামনে কোনও পোডিয়াম দেবেন না প্লিজ, কিংবা কোনও উঁচু টেবিল, আজকাল পা দুটোকে চোখের আড়াল করতে পারিনা একদম। তুমি কারণ জানতে চাইবে না কারণ তুমি জানো, কারণ তুমিও বিপ্লবী অথবা ভিক্টিম। কারণ তুমিও পলাতক, তুমিও সাঁতরে পার হয়েছ ভূমধ্যসাগর, তোমার ঘরেও আগুন লেগেছে, তোমার দেশও নিভে গিয়েছে যুদ্ধে, তোমার কোমরেও গোপন আছে দাগ, তোমার সীমান্তের ওপারেও, মেটামরফসিস!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *