একটি উত্তর আধুনিক সামাজিক পালা

সততা অতি বিষম বস্তু, যা দস্তুরমত সর্বনেশে। সে মাল এমনই সুন্দর যে ভয় করে। আর এ তো শুধু আজকের কথা নয়, কত ঠেকেছি, কত শিখেছি, এভোল্যুশনের অকল্যাণে এই তথ্য এখন আমাদের মগজে জিনগত বিদ্যের মত গাঁথা। তবুও তো রোজ সন্ধ্যের দিকে কত ফ্যাকাশে মুখ মেট্রো স্টেশনের একটা কোনা থেকে থার্ড রেল দেখে: জ্বলজ্বলে কঙ্কালের ডেঞ্জারবাণীর উল্টোদিকেই সুযোগ, ভীষণ সাহস দিয়ে গড়ব পরের চান্সে! ভাবে, পরের দানে, সোচ্চারে জানাবে বসের মূর্খামির কথা, মাসতুতো দাদার সাথে অন্যায় সম্পর্ক লুকোবে না কিছুতেই, অকপটে বলে দেবে সে কেমন কাফকাও পড়ে আর করণ জোহরও দেখে, ইংরিজি বলতে গেলে ফাটে, অথবা কতবার মনে মনে মৃত্যুকামনা করেছে নিজের শরীর নিঃসৃত ১২ বছরের অটিস্টিক জড়বস্তুটার! সততা তাই কখনও হয় নেশাদ্রব্যের মত, সমাজের যাবতীয় ডাবল স্ট্যান্ডার্ডস থেকে কিছুক্ষণের ছুটি নিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন। কখনও আবার হয়ত আত্মঘাতী বোমা; অথবা নিছক পেপার স্প্রে, এক বোতল সাহস! সত্যির কথা বলছিনা, তার পরম সত্ত্বা তো অধরা; কিন্তু সততা, সে যে কি ব্যাথাজাগানো সুন্দর তারই একপ্রকার ডেমো হল একটি উত্তর আধুনিক সামাজিক পালা। থিয়েটার ফরমেশন পরিবর্তকের একটা সৎ এবং নির্লজ্জ কাণ্ড।

 

আমি একে নাটক বলব কেবলমাত্র শব্দের দীনতার কারণে। পর্দা ওঠার আগে ওপাশ থেকে যে সুর ভেসে আসে, তাকে গান বললে কম বলা হয়, হুমকি টুমকি বলা যেতে পারে। স্ক্রিন নামানো, স্টেজের মানুষেরা তখনও অচেনা, শুধু তাদের কন্ঠগুলো ফুটছে, ফুটে উঠছে যে সুরে, পর্দা ভেদ করে তা দর্শকে ছড়াচ্ছে। সুর তো ছোঁয়াচে, বিপ্লবের মতই; স্টেজের তখনও হদিস অবধি নেই অথচ সমস্ত প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে যেন নিখুঁতভাবে রটে যাচ্ছে যে পরবর্তী ঘন্টাখানেক আর যাই হোক শান্তি দেবে না! স্টেজ জুড়ে এরপর তুমুল দাপটের সাথে উচ্চারিত হয়েছে একের পর এক সময়ের কথা, সময়বাহিত একটার পর একটা চরিত্রের কথা, কাউকে হয়ত আমরা নাম দিয়ে চিনি, কাউকে জীবন দিয়ে। মেয়েরহল্ড থেকে কার্ল মার্ক্স্ থেকে মমতা ব্যানার্জী থেকে মনীশ মিত্র – প্রত্যেকে স্বনামে, স্বমহিমায় এবং স্ব-কীর্তিতে এই মঞ্চের অংশ হয়েছেন এবং বরাদ্দ থাপ্পরটুকু খেয়েছেন। এরকমই এক দৃশ্যে এক চরিত্র যখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা বাক্য আউড়াতে গিয়ে হোচট খাচ্ছে বিশেষ্য ও বিশেষণের প্রয়োগ নিয়ে তখন খেয়াল হল এই মঞ্চে যেটা ঘটছে সেটা আসলে একরাশ বক্তব্য, সময়ই বলেছে যেসব কথা, ব্যাকরণের পরয়া না করেই যেখানে সেখানে বেনিযমে ছুড়ে দিয়েছে প্রশ্নচিন্হ। থিয়েটার ফরমেশন পরিবর্তকের এই কীর্তি কোনো একটা ঘটনার কথা বলে না, বদলে অনেক বিছিন্ন ঘটনা মনে করায়, আর ঘাড় ধরে দেখতে বাধ্য করে যে এই ঢাউস মানবসভত্যায় সামান্যই বিছিন্ন।  বোঝা যায় মানুষে মানুষে পার্থক্য অল্পই; চরিত্র বদলে বদলে তারা একসময় থেকে অন্যসময়ে দেখা দেয়, কিন্তু মিলে যায় সাহসে, প্রেমে, রামে অথবা হারামে। মাতঙ্গিনী হয়ে যায় লক্ষ্মীবাঈ; ভাই-বোন হয়ে যায় প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা স্বামী-স্ত্রী।

 

বস্টনের রাস্তায় একবার একটা বইয়ের ঠেলাগাড়ি দেখেছিলাম মনে আছে। রাস্তার ধরে দাঁড়িয়ে ছিল একা একগাদা দামী দামী ঝলমলে বই নিয়ে, যাদের অধিকাংশই পুরোনো বই; কিন্তু চারপাশে কোথাও কোনও মানুষ নেই পাহারায়। আছে একটা বাক্স যাতে বলা আছে বেচা-কেনার পুরো মাধ্যমটাই অনর সিস্টেমে (Honor System), বইগুলোর সামান্য কিছু দাম নির্ধারণ করে লেখা আছে কভারে, এরপর পছন্দ হলে নিজে থেকেই ওই বাক্সে যেমন মনে হবে তা রেখে যেতে। এইরকম নাকি চলে আসছে ২০০৬ থেকে। বাক্সের গায়ে কালো রঙের হরফে লেখা ছিল লংফেলোর একটা কথা, “I have an affection for a great city. I feel safe in the neighbourhood of man, and enjoy the sweet security of the streets.”  একাডেমীতে এই  নাটকের টিকিটের কোনও নির্ধারিত মূল্য ছিল না। দর্শক নিজের থেকে যে দাম দিতে ইচ্ছে করবেন টিকিট কাউন্টার থেকে সেই মূল্যের বিনিময়েই টিকিট পাবেন, এমনি নিয়ম। আমার খুব মনে পড়ছিল ওই ঠেলাগাড়িটার  কথা, সেদিন তো ওই বাক্সটার  দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম কতকিছু, ভেবেছিলাম এই যে বিশ্বাসটুকু নিয়ে ঠেলাটা দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় এক দশক ধরে এও কি একধরনের প্রথম বিশ্বসুলভ বিপ্লব? এই বিশ্বাস করতে পারাটাও কি একধরনের প্রিভিলেজ যার মেরুদন্ডে রয়েছে একটা বিরাট অংশের মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা? তারপর কতদিন কেটে গেছে, শুধু এইদিন নাটকের টিকিটটা হাতে নিয়ে মনে হচ্ছিল, সাহসের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ; বিশ্বাসের উপর সাহস হারানোও বোধহয় কোনো কাজের কথা না। এই নাটক সেই অর্থে সবার – যারা অভিনয় করেছেন, গান গেয়েছেন, আলো ফেলেছেন, মঞ্চ সাজিয়েছেন তারা যেমন আছেন – দর্শকও কিন্তু ততটাই রয়েছেন। তিনি এই ব্যবস্থায় আর ক্ষমতাহীন বিনোদনখেকো প্রজাতির একজন নন; তিনি দেখছেন, শুনছেন, হাসছেন, রেগে উঠছেন, আবার দামটাও অনুভব থেকে নির্ধারণের দায়িত্ব তারই উপর। যেকোনো কোলাবরেটিভ আর্ট ফর্মের একটা বিশাল বড় উপায় হল গিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস। জীবনেও যেমন। এই দলটি বিশ্বাস করেছে তেমন কত অচেনা মানুষকে, এই বিশ্বাসের জোরেই হয়ত নাটক চলাকালীন কারও মোবাইল ফোনও বাজেনি হলের কোনও প্রান্ত থেকেই। অথবা এটা একদম কাকতালীয়। কিন্তু সত্যিই বাজেনি। যেটুকু জানি, তাতে আর্থিক কারনেও এই নাটকের অনেক শো তেমন সম্ভব নয়। সত্যি বলতে কি, আমার যে তাতে বিশাল কোনও ব্যথা জাগছে তা নয়। কোনও অর্থেই এই পালাটি কালজয়ী মেটিরিয়াল নয়; সুখী বাঙালির তাতে অস্বস্তি হলেও, “জানিস খোকা আমাদের কিশোরবেলায় এই পালাটি যখন প্রথম দেখেছিলেম তখন রক্ত টগবগ ফুটেছিল, এখনও যতবার দেখি ততবার লোম খাড়া হয়, অতএব চল তোকেও দেখাতে নিয়ে যাই” স্বরূপ তৃপ্তি জোটার কোনও সিন নেই। যেমন নাটকের শেষ অংশে মনীশ মিত্রের চরিত্র এসে নাটক বন্ধ করতে বলছেন, ধমকাচ্ছেন, এবং পর্দা পড়ছে। বছর তিনেক বাদেও এর প্রাসঙ্গিকতা অল্পই থাকবে। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, এই একটি মিনিট দুয়েকের সিন কত মানুষের রাগের কথা তো বলছে।  তবে এরপেরই, শেষতম দৃশ্যে যখন নাটকের সকল মানুষ একসাথে গান গেয়ে বলে নতুন বাংলার স্বপ্নের কথা তখন ভারী আরাম হয়, ওই আবেগটুকু কিন্তু দেশ-কাল-সীমান্ত জয়ী এক ব্যাপার। বড় মিঠে সুর খানাও সেই গানের, কানে লেগে থাকে, আর একটু আধটু স্বপ্ন কানে লেগে থাকা ভালো। তবে আমার একরকম বোধ হল যে, নাটকে কারোরই আলাদা করে অভিনয়ের ক্ষমতা পরখের জায়গা বিশেষ নেই। নির্দেশনা ও রচনায় জয়রাজ হয়ত খানিক সচেতন ভাবেই এই নাটক গেঁথেছেন। যারা অভিনয় করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই যে  খুব অভ্যাসে নাটক করেন না সেকথা বোঝা যায়। কিন্তু তাতে এতটুকু বাধা পড়েনি আগুনে। বরং স্বাভাবিক লেগেছে, চেনা লেগেছে।

 

রোববারের আকাদেমির এহেন মঞ্চের কথা মনে করতে করতে হঠাত এখন মনে হচ্ছে, হয়ত একেই থিয়েটার বলব এবার থেকে অভ্যেস পাল্টে। যে থিয়েটার সমস্ত অর্থেই সব মানুষের থিয়েটার। যেখানে চরিত্র আমারই মত জামাকাপড় পরে হাত পা নেড়ে আমার কথাই বলছে। সেইসব কথাগুলো যেগুলো স্বীকার করতে গিয়ে, চেঁচিয়ে বলতে গিয়ে আমার শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে গুলির আওয়াজ শোনায়, হয়ত সরকারী চাকরিটা হাতছাড়া হয়, সংসার ভাঙে, বন্ধুরা ছেড়ে যায়। এরপর হয়ত নাটক দেখতে যাওয়াটা আর সুখী বিনোদন নয়। নাহলে চোখ বন্ধ করলেই কেন মনে হচ্ছে অন্ধকার মেট্রো স্টেশনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ, তাদের মুখগুলো কতদিন হলো কেউ দেখেনি, এমনকি মুখোশগুলোও ফ্যাকাশে — প্রত্যেকের চোখ সামনের পর্দার দিকে যা এখনও ওঠেনি, কেবল পর্দার ওপাশ থেকে সুর ভেসে আসছে আর মানুষ থেকে মানুষে রটে যাচ্ছে আজকের নাটকের বিষয়: তৃতীয় রেল — কতবার কতসময়ে যাকে যাবতীয় ভয় পেরিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়!

 

লেখাটি প্রাথমিক ভাবে “দেশের আগামীকাল” নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *