উইকিপিডিয়া, ফ্রি সফ্টওয়ার এবং স্বাধীনতা প্রসঙ্গে

আমার একজন অঙ্কের মাস্টারমশাই ছিলেন, ভীষণ রাগী। আমার সবসময় মনে হত যাবতীয় জটিল বিভত্স গাণিতিক সমস্যা তার ওই মেজাজের ভয়েই নিজেদেরই সমাধান করে ফেলত। আমি যখন থেকে দেখেছি তখন কিন্তু তার বয়স সত্তরের ওপর – কিন্তু অমন নিখুঁত শিরদাঁড়া আমি আর কখনও কোনও বয়সের মানুষেরই দেখিনি। বার তিনেক হার্ট এট্যাক আরও নানাবিধ শারীরিক সমস্যা ছাপিয়ে যখন গমগমে গলায় ধমক দিতেন কতবার সত্যি সত্যি কেঁপে উঠেছি। এক একটা সন্ধ্যের দৃশ্য ছিল – উনি মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটার ওপার থেকে কটমট করে তাকিয়ে রয়েছেন দুরূহ থেকে দুরুহ্তর অঙ্কের মত দেখতে একটা আস্ত বাঁশের দিকে, চোখের পাতা পড়ছে না বললেই চলে, এর মধ্যে শুধুমাত্র কাঠপোকারাই একটানা ঘ্যানঘ্যানে ছন্দে শব্দ করার হিম্মত দেখাচ্ছে, বাকি সমস্ত চরাচর অপেক্ষায়, কখন চশমা ছাপিয়ে চোখটা চকচক করে উঠবে, হালকা একটা হাসি এসে মিলিয়ে যাবে হুঙ্কারে, “কী অঙ্ক স্যার! নিমাই কুণ্ডুকে ঘোল খাওয়াবে ভাবছিল! থার্ড ক্লাস অনার্স হতে পারি, কিন্তু তাকিয়ে থেকে অঙ্কের হাড় পাঁজর অবধি দেখে নেওয়ার ক্ষমতা রাখি।” আমার মাঝেমাঝেই ওনাকে গল্পে পড়া দাপুটে শিকারীদের মত মনে হত, বাঘছালের বদলে ঘর ভর্তি খাতার পর খাতা সাজানো, তাতে সব প্রায় মানুষখেকো অঙ্কেরা বিভিন্ন নাটকীয় সন্ধ্যেবেলা শিকার হয়েছে। এই ইনিই মাঝেমধ্যে আমাদের বলতেন, “বুঝলে স্যার, জ্ঞান কারোর বাবার সম্পত্তি নয়।”

উইকিপিডিয়ায় আমরা ঠিক এইটাই ভেবে এসেছি। এই আগের গল্পটা ফাঁদার কারণ এটা বলার জন্য যে, এই একরোখা সত্তরোর্ধ মাষ্টার কিন্তু ইন্টারনেট থেকে বহুদূরে, আমি যতদূর জানি উইকিপিডিয়র অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেনও না। কিন্তু এই দাবীগুলো খুব সহজ দাবী, খুব বেসিক, বহুদিনের, এবং বহু প্রজন্মের। তার ট্রিগার ও প্রকার বদলেছে মাত্র, মেজাজটা কিন্তু একটুও অচেনা নয়। উইকিপিডিয়া শুরু হয় জ্ঞানকে মুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে। এই মুক্তির সংজ্ঞা রিচার্ড স্টলম্যান প্রণিত মুক্ত সফ্টওয়ারের চারটি মৌলিক ফ্রিডমের দাবীকেই ফলো করে। সফটওয়ারটি ব্যবহারের স্বাধীনতা – সফটওয়ারটির সোর্স কোড পাঠ করার স্বাধীনতা – অন্যদের সাথে সফটওয়ারটি শেয়ার করার স্বাধীনতা – এবং তাকে সাধ্যমত উন্নত করার স্বাধীনতা, এইসমস্তই একজন যেকোনো ব্যবহারকারীর থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি। উইকিপিডিয়া অন্যদিকে একটি বিশ্বকোষ – কোনও সফ্টওয়ার নয় – এখানে এমন একটা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি আমরা, যেখানে প্রতিটি মানুষ বিনামূল্যে মুক্তভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করতে পারবে। এখান থেকে যেমন তথ্য জানা যায়, ব্যবহার করা যায়, তেমনি নতুন তথ্য বা বিশেষ কোনো বিষয়বস্তু সংযোজন করা যায়। উইকিপিডিয়াতে এখন পর্যন্ত তিন কোটি ২০ লাখের বেশি নিবন্ধ রয়েছে। পৃথিবীর ২৮৭টি ভাষায় উইকিপিডিয়া চালু হয়েছে। আর প্রতি মাসে আমাদের ওয়েবসাইট প্রায় ৫৫ কোটি মানুষ ব্যবহার করে। উইকিপিডিয়া থেকে শুরু হয়ে এই প্রয়াস ছড়িয়ে গিয়েছে আরও বেশ কয়েকটি সিস্টার প্রজেক্টসের মধ্যে দিয়ে – তাদের চেষ্টা আরও অন্য বিষয়ের মুক্তির কথা বলে। উইকিবুকসের মূল স্বপ্ন যদি হয় টেক্সটবুকের মুক্ত অল্টারনেটিভ তৈরী করা, উইকিমিডিয়া কমন্স নামক চেষ্টাটি কপিরাইট কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কয়েক লক্ষ ছবিকে দিয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানা ছাপিয়ে হকের স্বাধীনতা। উইকিসোর্স তেমনি তৈরী করেছে একটি মুক্ত পাঠাগার – পাবলিক ডোমেনে এসে যাওয়া কত বই সেখানে ঠাঁই নিয়েছে। কত লেখক দুনিয়াজুড়ে নিজেদের সৃষ্টি গুলোকে রেখেও দিচ্ছেন এখানেই, উপযুক্ত ক্রিয়েটিভ কমন্সের লাইসেন্স সমেত। উইকিপিডিয়া এবং বাকি প্রজেক্টগুলোর কাঠামো, অর্থাৎ যে সফ্টওয়ারটি এই বিশাল কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি, সেই মিডিয়াউইকিও কিন্তু একটি মুক্ত এবং ওপেন সোর্স সফটওয়ার, এবং তাতে অবদান বহু, বহু ডেভেলপারের।   উইকিপিডিয়া সহ এই প্রজেক্টগুলোর ছাতা রয়েছে এখন – উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশান – একটি নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার বয়স উইকিপিডিয়ার থেকে কম, মানে, এই বিশাল প্রচেষ্টার প্রাথমিক মডেল কিন্তু ভলেন্টিয়ার কন্ট্রিবিউশান নির্ভর। মানুষ, আমাদের পাশের বাড়ির, পাশের শহর – দেশ – মহাদেশের মানুষের ইচ্ছা দিয়েই কিন্তু তৈরী হয়েছে কোটি কোটি নিবন্ধ। ইচ্ছেই তো, প্রথমে তো ইচ্ছে, তারপর তারা ভালোবেসেছে, ভালোবেসে চলেছে। এবং সর্বোপরি এই বিপ্লবটুকু তাদের প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, হচ্ছে। এই লড়াই এর মজা হল এখানে সবাই রাজা, অথবা সবাই মজুর, সবাই, সমান। একজন  অনামী ব্যবহারকারী তার IP address টুকু ইতহাসের জিম্মায় রেখে অন্তত কয়েক সেকেণ্ডের জন্য হলেও বদলে দেওযার ক্ষমতা রাখেন একটা আস্ত বিশ্বকোষের পাতা। তারপর যদি তাতে কিছু ভুল থাকে অথবা এই বদলটি নিছকই খারাপ উদ্দ্যেশ্যে হয়, কিছু মাত্র সেকেন্ডের মধ্যেই তার ব্যবস্থা নেন অন্য কোনও ব্যবহারকারী।  আবার এই করতে গিয়ে কখনও হয়ত বিবাদও বাধে প্রবল তখন সিনে আসেন অ্যাডমিনগণ – এরাও ভলেন্টিয়ার – হয়ত বেশ খানিকটা অভিজ্ঞ, তাই এইধরনের ইমার্জেন্সি সামলানোর জন্য কিছু বাড়তি হাতিয়ার রয়েছে তাদের কাছে। কিন্তু বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাও সবার। আসলে, যেকোনো কোলাবরেটিভ কর্মের একটা বিশাল বড় উপায় হল গিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস। জীবনেও যেমন। উইকিপিডিয়া এবং সমস্ত ফ্রি ও ওপেন সোর্স সফ্টয়ারেও তাই।

Karen, আমার পরিচিত একজন মানুষ, নিজেকে সাইবর্গ ল-ইয়ার বলেন। ক্যারেনের শরীরে পেসমেকারটি বন্ধ হলেই ক্যারেন মারা যাবেন। ওর দাবী শুধু এইটুকুই যে ওই পেসমেকারের সফ্টওয়ারটি সম্পর্কে উনি জানতে চান। আশ্চর্য এই যে, যে যন্ত্র এখন ক্যারেনের মত আমাদের অনেকের শরীর চালায় তার সফ্টওয়ারটুকু সম্পর্কে আমদের কিচ্ছু জানার অধিকার নেই। অধিকার আছেটাই বা কার, এরকম প্রশ্ন করেছেন ক্যারেন, আমার ডাক্তারের? যার কাছে আমি টেস্ট করাতে যাচ্ছি? আমার শরীরের একটা যন্ত্র ঢুকে শাসন চালাবে কিন্তু তার সিকিউরিটি সম্পর্কে আমাকে কতটুকু জানতে দেওয়া হচ্ছে? ক্যারেন Software Freedom Conservancy-র Executive Director – লড়াই করছেন আরও কয়েক লক্ষ মানুষের সাথেই, একসাথে, ভীষণ মৌলিক একটা দাবীর পক্ষে। যাদের পাশে থেকে লড়াই করছেন তাদের,ওই ট্রিগার, ট্রিগারটা হয়ত সম্পূর্ন অন্য কিছু। কিন্তু লড়াইয়ের ভাষাটা এক।  সম্প্রতি একটা কনফারেন্সে জানতে পারলাম মধ্যপ্রাচ্যে নাকি উইকিপিডিয়ার ব্যবহারকারী এবং রচনাকারীর মধ্যে নব্বই শতাংশই মহিলা। আমরা কিন্তু বিশেষ চিন্তিত এমনিতে উইকিপিডিয়ায় কনট্রিবিউটার হিসেবে মহিলাদের খুব কম অংশকেই দেখা যায় তাই নিয়ে, অথচ যেসব শহরের মেয়েদের চোখটুকুও পারলে ঢেকে রাখা হয় রাস্তা ঘাটে, তারাই এমন বিপ্লব ঘটাচ্ছে অন্য গলিতে। স্টলম্যান ১৯৮৫ তে যে দাবি এনেছিলেন, তারপর তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে কত মানুষ, সাধারণ মানুষ। একটা দাবীর থেকে তৈরী হয়েছে কত সফ্টওয়ার, প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ, ইন্টারনেটে জাঁকিয়ে বসেছে উইকিপিডিয়ার মত ওয়েবসাইট, দিনের পর দিন চ্যালেঞ্জ করেছে সৃষ্টির উপর ব্যক্তিগত মালিকানাকে, কপিরাইটকে – খুব কাছ থেকে দেখে বুঝেছি কি এক বিপুল কাণ্ড! অথচ কাছ থেকেই দেখা বোঝা যায় কি সহজ সব তাগিদই কিন্তু পাশে এনেছে কোথায় কোথায় ছড়িয়ে থাকা এত মানুষকে।

আর, এরপর যেমন বিভূতিভূষণ বলেছিল:

“অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ… সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমাকে ঘরছাড়া করে এনেছি!… চল এগিয়ে যাই!”
(প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে সোমবার, মার্চ ৯, ২০১৫’তে বলা কিছু কথার থেকে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *