যে সব তুচ্ছ কারণে বেঁচে থাকা

যার কথা মনে পড়ার বিশেষ কোনও কারণ নেই, তার কথা মনে পড়ছে। বহুযুগ পরে তার গলার আওয়াজ শুনি সপ্তাহ দুই আগে। কথায় কথায় বলি, “খুব বেশিদিন বেঁচে থাকার কোনও কারণ দেখছি না।”

এটা কিছু নতুন নয়, সে নিজেও বহুবার জানিয়েছে তার জেলে যাবার পরিকল্পনা, উচ্চারণ করেছে আত্মহত্যার কথা। মৃত্যুকে নিয়ে আমরা দুজনেই বরাবর একটা আপাত বস্তুবাদী আবেগ থেকে আলোচনা করেছি। এটা লিখতে গিয়ে মনে হলো – বস্তুবাদী আবেগ বলে আদৌ কিছু হয় কিনা, হলেও তার কোনও তাত্বিক সংজ্ঞা আমার জানা নেই। তবু, এই যে যার কথা আজ মনে পড়ার কোনও কারণ ছিল না, তার সাথে আমার অনেক আলাপচারীতাকেই এই শব্দবিন্যাস দিয়ে বর্ণনা করা যায় বলে মনে হয়।

যার কথা মনে পড়ার কোনও কারণই নেই, সেই সে, তার অভ্যাসগত নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল, “জানিনা সুচেতা। তোমার বাড়িতে যেদিন প্রথম গিয়েছিলাম তোমার সাথে আলাপ করতে, সেদিন তুমি একটা হলদে জামা পড়েছিলে। খানিক আলাপের পর আমাকে জিগ্যেস করলে আমি তোমার কাছে কাঁদতে পারব কিনা। আমাদের আলাপের মিনিট কুড়ির মধ্যে এই প্রশ্নটা তুমি করলে। আর আমিও বলে ফেললামঃ হ্যাঁ, পারবো। যখন মৃত্যুর কথা ভাবি তখন ওই মুহূর্তটার কথা মনে পড়ে। এই বিশাল পৃথিবীর অনন্ত কালের ইতিহাসের কাছে ঐ মুহূর্তটা কতটুকু ? অথচ মনে হয় এইরকম সব তুচ্ছ ঘটনার জন্যই বোধহয় মানুষ বেঁচে থাকে।”

এর সপ্তাহ দুয়েক পরে আমি সাইকায়াট্রিস্টের ঘরে পৌঁছই। বড় বড় জানলা দিয়ে প্রথম বিশ্বের নিরিবিলি পথঘাট দেখা যাচ্ছে। যা দেখলে মনে হয় এই পৃথিবীর একমাত্র সত্য হল পরিপাটি করে কাটা ঘাস আর রেশমের মত চকচকে রাস্তাঘাট। সেইসব মিথ্যের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আমি আমার অগোছালো তৃতীয় বিশ্বের যাপন উজাড় করে দিচ্ছি একজন সম্পূর্ণ অপিরচিত মানুষের কাছে।  হাসপাতালে তার পদ কেয়ার কোওরডিনেটর। তার চোখ, মুখ, গায়ের রং, ময়লা রঙের শার্ট সবকিছু থেকে ঝরে পড়ছে সহমর্মিতা।  অনেকক্ষণ জলে ডোবা মানুষ বাতাসের সংস্পর্শে এলে যে ভাবে বেঁচে ওঠে, আমি তার সেই মায়াময় মুখের দিকে তাকিয়ে বিরামহীন বর্ণনা করে যাচ্ছি আমার জীবন, বীভৎস সব ভাবনা, রাতের পর রাত ঘুম না আসা, ভুতের ভয়, জেগে থাকার প্রতিটা মুহূর্তে আঘাতের ভয়, প্রেম, অপ্রেম, যাবতীয় দুঃস্বপ্ন যার থেকে পালাতে পালাতেই আমি তার ঘরের কোণার এই সোফাতে আপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি। সে আমকে জিগ্যেস করল আমার শরীরের ইতিহাস, আমি তাকে বলছি নিজের শরীরের উপর অধিকার হারানোর ইতিহাস। বলতে বলতে হঠাৎ থমকে যাই, “I don’t know if I can call this one an assault”। কেয়ার কোওরডিনেটর এতক্ষণ নোট নিচ্ছিলেন, তার কলম থামিয়ে তিনি এবার আমার দিকে তাকালেন; কি গভীর, দৃঢ়, অথচ মায়াময় তার চাহনি। আমাকে খানিক সময় দিলেন বিবেচনা করতে – নির্যাতনের দায় কার হয়? নির্যাতনের সংজ্ঞা কি? Assault এর বাংলা কি নির্যাতন? আমার sexual assault এর ইতিহাস, অধিকারহীনতার ইতিহাস, আতঙ্কের ইতিহাস, অসুখের ইতিহাস, আমার শরীরের ইতিহাসের কথা আমি কেন ইংরিজিতে ভাবি, কেন বাংলাতে না?

কেয়ার কোওরডিনেটর হয়তো আমার হতাশা আন্দাজ করতে পারেন। আমার মনোযোগ ফেরাতে কলমের ঢাকনা বন্ধ করেন, অথবা আমার নৈঃশব্দ্য এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে কলমের সামান্য শব্দে প্রাণ ফিরে পাই।  আমার দিকে তার সেই সহজ, শান্ত, মায়াময় চাহনি অবিচল রেখে তিনি বলেন, “if it felt like an assault, it was an assault”।

যার কথা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক সেই তার কথা মনে পড়ে যায় – এইসব তুচ্ছ মুহূর্তের কাছে হঠাৎ একদিন আত্মসমর্পণ করব বলেই আমাদের এই বেঁচে থাকা। আমি কেঁদে ফেলি, আমাদের আলাপের মিনিট কুড়ির মধ্যে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত আত্মীয়ার কাছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *