অপ্রেমের কাব্য

তোর সাথে আমার আলাপ কবে বা কিকরে কিছুতেই মনে পড়ে না। তোকে যখন ভাবি তখন কেবল তোর বড় বড় চোখদুটো মনে পড়ে – আর মনে পড়লে মনে হয় ঐ চোখ দুটোর সাথে আমার অনেক দিনের পরিচিতি। তোর চোখের সাথে আমার এই পরিচয়ের কোনও উল্লেখযোগ্য অতীত মনে পড়ে না – খালি মনে হয় – ওরা ছিল।

তোকে আমার এই চিঠি প্রেমের চিঠি। এখন দারুণ অপ্রেমের দিন। এইসব ঘোর অসময়ে মনে হয়, প্রেমের চিঠি একমাত্র তাকেই লেখা যায়, যার শরীরে অফুরান দয়া।

দয়া শব্দটা অদ্ভুত। বা হয়ত বাংলা ভাষাতে এই শব্দের এক অদ্ভুত প্রয়োগ ঘটেছে সর্বদা।  প্রভু তার ভৃত্য কে দয়া করেন। জমিদারের দয়ার উপর নির্ভর করে চাষির জীবন। গৃহিণীর দয়াতে জলখবার জোটে বাড়ির কাজের লোকের। তাও রোজ খাবার পেলে “ওদের” অভ্যেস খারাপ হয়ে যাবে, তাই পি সি চন্দ্রের নতুন স্কিমে তিন লক্ষ টাকা হেলায় দান করে এসে, সেই দয়ার পাটিগণিত কষতে হয় গিন্নিমাকে। আর দয়া করেন ভগবান তার ভক্তকে। আমার সীমিত ভাষাজ্ঞানে এবং অনুভবে লক্ষ্য করেছি দয়ার প্রবাহ মূলত একমুখীন – ক্ষমতাবানের ইচ্ছানুযায়ী, ক্ষমতার থেকে ক্ষমতাহীনের দিকে।

অথচ আমার আস্থা অন্য এক প্রকারের দয়াতে – ভাঙ্গাচোরা নারীদেহের দয়া। এ এক অদ্ভুত সঞ্জীবনী। এই দয়াকে সাহিত্যে লেখা হয় না, ইতিহাসে এর নাম পরাজয়। বছর দুই আগের এক দুপুরের কথা, তুই মনে করালি কত কত বছরের পর সেইদিন আমাদের কথা হচ্ছে। বললি, “ও আমাকে এখনোও ফোন করে জানো। মদ খেয়ে। ওর নতুন বান্ধবীর সাথে ঝগড়া হলে। ভোর সাড়ে চারটের সময় ফোন করে কাঁদে।” সেদিন তোর গলায় যে কষ্ট ছিল সেটা আমি আমার মধ্যে টের পাচ্ছিলাম – টের পাচ্ছিলাম আমার কানের লতিতে, ঠোঁটের কোণায়, বাম উরুতে, ডান স্তনে।

ভালবাসার অন্য নাম ক্ষয়? প্রতিটা নারী শরীরই কি আসলে শরীরের ধ্বংসাবশেষ ?

আমি তোকে সেসব না বলে জিগ্যস করেছিলাম, “তুই ফোন ধরিস কেন?”

তুই বলেছিলি, “কি করব বল? বুঝতে পারি ও কষ্টে আছে”

আমার আস্থা এই বেহিসেবি দয়াতে।

আমি আমার ছিন্নভিন্ন শরীর নিয়ে বসছি ইতিহাসের কাছে। ইতিহাসের এই ময়দানে পুরুষতন্ত্রের কাছে নারী শরীরের বারংবার পরাজয়। আমি প্রতিটি পরাভূত নারীর ঘন লোমে আস্থা রাখছি। আস্থা রাখছি বন্ধ্যা নারী শরীরের মাতৃত্বে, অগোছালো শাড়ীর নীচে পুরুষাঙ্গের গ্লানিতে, স্কুল-ফেরতা যে মেয়েটি কোনওরকমে ঢাকার চেষ্টা করছে নীল স্কার্টে  রক্তের দাগ, আমি আস্থা রাখছি তার আত্মবিশ্বাসে। আমার বিশ্বাস আমাদের এই অপ্রেমের কাব্যে।

এরপর হয়তো আমাদের হঠাৎ দেখা হবে কোনও মিছিলে। অসংখ্য মানুষের মুখ আর মুখোশ পেরিয়ে আমি খুঁজে নেব পরিচিত দুটো চোখ। মানুষের মুক্তির আকুল স্লোগানে গমগম করবে কলেজস্ট্রিট, আর সেইসব কোলাহলের মাঝেই ঘটে যাবে আমাদের গোপন সম্মেলন। ক্ষমতার বিরুদ্ধে অন্তিম সংঘর্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, সখী, আমি তোকে জানিয়ে যেতে চাই বিপ্লবের কাছে আমার গোপনতম দাবীটুকু – একদিন, কোনও এক অসহায় রাত্রে, আমরা নিজেদের জন্যেও বরাদ্দ রাখতে পারব কিছুটা দয়া। সেইদিন, ইনশাল্লাহ, আমরা ঠিক ফোন কেটে ঘুমিয়ে পড়তে পারব পাশ ফিরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *