অনুবাদের প্রযুক্তি, প্রযুক্তির অনুবাদ

“Bless thee, Bottom, bless thee. Thou art translated.”

  • William Shakespeare, A Midsummer’s Nights Dream, Act 3, Scene 1

 

বদল আর অনুবাদের যে ফারাক তা চমৎকার মজার সাথে সামনে এনে দিয়েছিলেন শেক্সপীয়র,

কুইন্সের এই বয়ানের মধ্যে দিয়ে। আসলে বদল তো অনেক রকমের হয় — কথার থেকে গান, স্লোগান থেকে ফিসফাস, ফিসফাস থেকে চিৎকার, মানুষ থেকে উন্নততর মানুষ, ভাষার থেকে ভাষা — এদের মধ্যে বদলেই থমকে থাকে কিছু ঘটনা, আর অনুবাদে উত্তীর্ণ হয় কিছু । অনুবাদের প্রাথমিক শর্তই থমকে যাওয়া কে চ্যালেঞ্জ জানানো। যে চ্যালেঞ্জকে ঘাড়ে নিয়ে

একই উপন্যাস-মহাকাব্য-নাটক-সাহিত্যের একাধিক মানুষের অনুদিত রূপের সন্ধান পাওয়া যায় একই ভাষাতে। এই একই চ্যালেঞ্জের ঘোরতর প্রয়োগ থাকে সাহিত্যের এবং সৃষ্টির প্রাসঙ্গিকতাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও। সৃষ্টি, সে যেরকমই হোক, তাতে সৃষ্টিকর্তার ভৌগলিক অবস্থানের প্রভাব তো পড়েছেই, যুগে যুগেই পড়েছে। এমনকি যে সাহিত্যকে কালজয়ী বলা হয়েছে, দেশ-সীমান্তকে জয় করে প্রজন্মের পর প্রজন্মেরর মানুষকে যে সাহিত্য বিদ্ধ করেছে, সেই সৃষ্টিরও তো দায়িত্ব থেকেই যায় প্রাসঙ্গিকতাকে সব ব্যবধান পেরিয়ে অটুট রাখার। সে সময়ের ব্যবধানই হোক, অথবা যুগের কিম্বা নিছক ভৌগলিক দূরত্বটুকু । দায়িত্ব থাকে ভাষার, এবং যে অথবা যারা এই সৃষ্টিকে নতুন ভাষার সাথে পরিচিত করবেন, নতুন সময়কে দেখাবেন গত সময়ের এক সাহিত্য। অর্থাৎ, যারা অনুবাদ করবেন। এই সবটুকুই আবারও যেমন জ্ঞানের ক্ষেত্রে সত্যি, ততটাই সত্যি নিছক তথ্যের জন্য। এখন আবারও মনে করানো ভালো প্রাসঙ্গিকতার কথা, ইন্টারনেটের প্রাসঙ্গিকতা এই সময়ে দাঁড়িয়ে অস্বীকার করতে চাইলে দারুণ ঝামেলায় পড়তে হবে। মেনে নিতে হবে তথ্য এখন অনেক বেশি দ্রুতগামী এবং সুলভ, সবই সেই ইন্টারনেটের দাপটেই। তথ্যের অনুবাদ এবং তার প্রয়োজনীয়তা তাই, আবারও, গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আমার ব্যক্তিগত প্রয়াসের মধ্যেও  এই অনুসন্ধান বার বার বজায় থেকেছে, কীভাবে ইন্টারনেট কিছুটা হলেও দায়িত্ব নেবে অনুবাদ এবং সর্বোপরি ভাষার বিস্তারের।

 

ইন্টারনেটের কাছে সব সমস্যার সমাধান আশা করার মধ্যে একধরণের ইউটোপিয়া রয়েছে। কিন্তু সেই কল্পনারও প্রয়োজন আছে। তাই প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে চেষ্টা আমরা প্রযুক্তি দিয়ে ঘটানোর প্রস্তাবনা রাখছি, চেষ্টা করছি, এবং কিছু হয়ত সম্ভবও করে ফেলেছি, তার অনেকটাই এখনও বেশ বাদীয় স্তরে। যেরকমটা থাকে শুরুতে, তারপর তো দিনবদল ঘটে। বছর চার কি পাঁচ আগে আমার এক বন্ধুর সাথে যখন প্রথম এই নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু, তখন দেখা গেলো উইকিপিডিয়ার নিবন্ধগুলোকে অনুবাদ করার জন্য কোনও সহজ উপায় নেই। অথচ উইকিপিডিয়া কিন্তু তখনও বিভিন্ন ভাষা মিলিয়ে মো৯১৯১৯ টি ভাষাতে বর্তমান। ইংরাজি ভাষার মত হয়তো অত বৃহৎ সম্ভার তার নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই খুব কমও নয়। খুব সহজ হিসেবে দেখানো যায়, কত কত নিবন্ধই প্রাথমিক ভাবে এক ভাষাতে লেখা হচ্ছে, তারপর তার অনুবাদ হয়েছে অন্য ভাষার উইকিপিডিয়াতে। ইংরাজিতে টাটকা নিবন্ধের সংখ্যা বেশি, স্বভাবগতভাবেই, তারপর তার অনুবাদ ছড়িয়েছে নানা ভাষা সমূহে। অথচ, কোনও সরল উপায় নেই এইটে ঘটানোর। ব্যবহারকারীকে কম্পিউটারের একটি ট্যাবে প্রাথমিক নিবন্ধটুকু খুলে রেখে পাশের ট্যাবে নতুন নিবন্ধটা তৈরী করতে থাকতে হবে। বিষয়টা শুধু শ্রমের কিন্তু নয়, সমস্যা এখানেও, এই মুক্ত বিশ্বকোষটির অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান রাজনীতিটাই সকলের অধিকারের কথা বলে। সমস্ত মানুষ মিলিয়ে একটা বিশ্বকোষ তৈরী করে তোলার অধিকার, তাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার অধিকার, এবং সর্বপরি দেশ-কাল-শ্রেণী পেরিয়ে সবার ব্যবহারের অধিকার। জ্ঞানকে মুক্তভাবে চড়িয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা এবং আদর্শ একভাবে বাধাই তো পায় যদি সমস্ত ভাষাতে তাকে চড়িয়ে না দিতে পারা যায়। আমরা প্রাথমিক ভাবে কাজ শুরু করি গুগলের ট্রান্সলেশনের একটি সফ্টওয়্যার দিয়ে, যেটা এখনও বেশ হতাশাজনক, তখন তো ছিলই।  তবে এই ব্যবস্থাটার একটা ভালো দিক হলো এতে, আমাদের প্রযুক্তির ভাষাতে যাকে বলে  ‘রিয়্যাল-টাইম কোলাবরেশন’, সেইটি ঘটানো যায়। মানে হলো, আমার এই বন্ধু যেমন থাকত দেশের দক্ষিণে, আর আমি কোলকাতায়। কিন্তু এই সুবিধাটুকু চমত্কার, যেখানে একটাই পাতা আমরা দুজনে দেশের দুই প্রান্ত থেকে একইসাথে অনুবাদ করতে পারছি, আবার এমন ব্যবস্থাও থাকছে যেখানে আমরা নোট আদানপ্রদানও করতে পারছি। এই ঘটনা তখনও উইকিপিডিয়াতে নেই, থাকলেও তা নিতান্তই তত্বতুকু। ওই যেমনটা থাকে শুরুতে, আর তারপর দিনবদলও তো ঘটে। ২০১৪ তে আমরা কাজ শুরু করি ‘কন্টেট ট্রান্সলেশন’ নামক যে প্রকল্পটার, তাই দিয়ে এখন ২২টা ভাষার উইকিপিডিয়া মিলিয়ে হাজারেরও বেশি অনুবাদ ঘটে গিয়েছে। রিয়েল টাইম কোলাবরেশন এখানে নেই, উইকিপিডিয়ার মত একটা প্রবল এবং প্রকাণ্ড জনবহুল কমিউনিটিতে তার ব্যবহার কতটা সদর্থক হবে সবসময়, এটা নিশ্চয় আলোচনার দাবি রাখে।

 

‘কন্টেট ট্রান্সলেশনে’ ব্যবহারকারীকে ‘মেশিন ট্রান্সলেশনের’ ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে। উইকিপিডিয়াতে বিশেষ করে, আর অনুবাদের যেকোনো ক্ষেত্রেই মেশিন ট্রান্সলেসনের ভূমিকা কতটা এবং কীভাবে রয়েছে, এই নিয়েও যথেষ্ট তর্কের অবকাশ রয়েছে। মেশিন ট্রান্সলেশনের আক্ষরিক মানেটাই সেখানে বেশ সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রযুক্তিগত ভাবে মেশিন ট্রান্সলেশন বেশ জটিল, তবে এই ক্ষেত্রে প্রধানতম দায়িত্ব থাকে তাকে ক্রমাগত তালিম দিয়ে যাওয়ার। শব্দের সম্ভার, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষাতে অনুবাদকালীন কীভাবে শব্দের ভাব ভাষা অনুযায়ী বদলে বদলে যাবে, বাক্যের গঠনে কি বদল ঘটবে নতুন নতুন ভাষাতে, এবং সঠিক বিন্যাসে – এটা কখনোওই কেবলমাত্র একবারের কাজ নয়। যত যন্ত্রটা ব্যবহৃত হবে, তত তা অব্যর্থ হবে। যে যন্ত্রের সাথে মানুষের অভিব্যক্তির প্রকাশ জড়িয়ে থাকবে, যন্ত্র সেখানে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু স্বয়ম্ভু নয়। মানুষকে ক্রমাগত সেই প্রসেসে উপস্থিত থাকতে হয়। এইবারে সমস্যা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এই যে মেশিন ট্রান্সলেশনের ব্যবস্থা গুলো বর্তমানে প্রাপ্য তার বেশির ভাগই বেশ করুণ। অন্তত বাংলা ভাষাতে তো নিশ্চিত ভাবে করুণ — এর দায় হয়তো কেবল প্রযুক্তির নয়, অনেকটাই আমাদেরও। ‘কন্টেট ট্রান্সলেশন’ নিয়ে এই বিতর্ক ছিলো সবসময়ই, এমনকি উইকিপিডিয়াকে অনুবাদ করার প্রথম কালে যখনও কোনোও একটি যন্ত্র সেই সুবিধা দিয়ে ওঠেনি, তখনও বলে দেওয়া হয়েছে, অনুবাদ যদি কেউ করেন, তা যেন শুধুমাত্র মেশিন-ট্রান্সলেটেড না হয়। উইকিপিডিয়াকে সর্বদাই তথ্যের পরিমাণসহ তার উত্কর্ষতাকেও বজায় রাখতে হয়েছে। এবং ভেবে দেখলে এই বিশ্বকোষের প্রয়োজনীয়তা তো সর্বক্ষণের ঘটনা, পৃথিবীর একপ্রান্ত যখন তথ্যের বদল ঘটাচ্ছে, এবং যে কেউ ঘটাচ্ছে, অন্য প্রান্ত তখন সেই তথ্য পড়ে নিচ্ছে। তাই উত্কর্ষতার সাথে কোনও সমঝতার জায়গা এইখানে বস্তুত নেই। তাহলে সমস্যা থাকে মেশিন ট্রান্সলেশনে, যেখানে অনেক অনুদিত বাক্য এবং শব্দেরই দেখা যাবে কোনও মানেই দাঁড়াচ্ছে না। তবে সমস্যা না বলে আবারও হয়তো একেও একধরণের চ্যালেঞ্জ বলা ভালো। একটা ৬০,০০০ শব্দের নিবন্ধের মধ্যে কিছুটাও যদি যন্ত্র নিজে অনুবাদ করতে পারে, সেক্ষেত্রে তাকে আরও উন্নত করে তোলার দায়িত্ব মানুষ নিতে পারে। কিন্তু এই অন্তত কিছুটাকেও অব্যর্থ করে তুলতে পারাটাও একটা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। সেখানে প্রবল ভুমিকা নিতে পারে মুক্ত সফ্টওয়্যার, এমনকি অর্থনৈতিক কারণেও। যে সফটওয়্যার বোঝাই যাচ্ছে মূলত মানুষের ট্রেইনিং-নির্ভর তাকে ব্যাপক ভাবে মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলাটা একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেই ব্যবস্থাতে দাঁড়িয়ে গুগলের ওই ট্রান্সলেশনের মেশিনটি যদি কেউ ব্যবহার করতে চান নিজস্ব সফ্টওয়ারে, সে এক বিপুল অর্থের ব্যাপার। কারণ এটি নন-ফ্রি, অর্থাৎ প্রযুক্তিটিকে নিজের মত করে ব্যবহার করতে গেলে তাকে অর্থের বিনিময়ে কিনতে হবে। এও একধরণের বাধা। আর এই বাধার বিকল্প হিসেবে সুযোগ তৈরী করে দিতে পারে প্রযুক্তিগত ভাবে একই রকম একটি ব্যবস্থা যে কিনা মুক্ত এবং সহজে লভ্য। এতে প্রযুক্তির যতটা লাভ, মানুষেরও লাভ কিছু কম নয়।

 

মেশিন ট্রান্সলেশন নিয়ে যে কথা গুলো উইকিপিডিয়ার ক্ষেত্রে বললাম, যেকোনো অনুবাদেই তা বিরাজমান। তবে আবারও রিয়্যাল-টাইম কোলাবরেশনে ফিরে আসা যাক। এই যৌথ প্রয়াসের ঘটনাটিকে প্রযুক্তিগত ভাবে সম্ভব করে তুলতে পারলে মেশিন ট্রান্সলেশনকেও হয়তো আরও নিপুণভাবে কাজে লাগানো যাবে, আর যতদিন তা না হয়, অন্তত শ্রমের ভাগ করে নেওয়া যাবে। কোলাবরেশন ন্যায্যভাবেই প্রধান হাতিয়ার, ইন্টারনেট যেভাবে অনুবাদকে বহতা দিতে পারে সেই ক্ষেত্রে। সুমন যখন বব ডিলানকে অনুবাদ করছেন, সেই কথা ধরা যাক। “Too many people have died” হয়ে যাচ্ছে “বড্ড লোক গিয়েছে বানের জলে ভেসে”। আবার সেই প্রাসঙ্গিকতাতে ফিরে আসি, বান কিন্তু ডিলানের প্রবল দেখার সুযোগ ঘটার কথা নয়। কিন্তু সুমন অনুবাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন সেই অভিঘাত  তৈরী করার, যেখানে ডিলানকেই প্রাসঙ্গিক করে তুলছেন না, মৃত্যুকেও মনে করাচ্ছেন আমাদের চেনা ভযঙ্করতা দিয়ে। এইখানেই জয়। ইন্টারনেট পারে এই চিনিয়ে দেওয়া গুলোকে সহজ করতে, কিন্তু তার জন্য যৌথ প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তা প্রবল। কোনও একা মানুষের দায়িত্ব তো এটা হওয়ার কথাও ছিলনা কখনও, কালেক্টিভই তো সেই চ্যালেঞ্জ নেবে। ভ্যান গগের পটেটো-ইটার্স কে আমরা খনি-শ্রমিক বলে ডাকব কিনা সেই সিদ্ধান্ত হবে একদল মানুষের। এইরকমটাই হতে পারত, হওয়ার কথাও ছিল। আর সেই সুযোগ দেবে, দেওয়ার ক্ষমতা আছে ইন্টারনেটের।

 

তবে প্রযুক্তিগত ভাবেও এটাকে পুরোপরি সম্ভব করে তোলা খুব সহজ কথা নয়। যেরকমটা মনে হয় আর কি শুরুতে, তারপর তো সম্ভব হয়ে থাকে নিতান্ত অসম্ভবও। শুধুমাত্র ইংরাজি ভাষাতে শুরু হওয়া নিবন্ধগুলোকে অন্য ভাষাতে অনুদিত করে চলার যে ধরনকে স্বভাবগত বলেছি কিছু আগে, তার একরকম বদল ঘটানোর সম্ভাবনা কিন্তু রয়েছে এই ওয়েব-ট্রান্সলেনের হাত ধরেই। অনুবাদ বলতেই এই যে এতদিন ধরে প্রথমেই মনে করে নেওয়া হয়ে এসেছে, ইংরাজি থেকে অন্যান্য ভাষাতে আর আঞ্চলিক থেকে ইংরাজির অনুবাদ, এই দুই ধারার কথা। আঞ্চলিক থেকে আঞ্চলিক ভাষাতে সাহিত্য, সৃষ্টি এবং তথ্যকে ছড়িয়ে দেওয়াকেও ততটাই স্বাভাবিক করে তোলার দায়িত্বটুকু নিতে পারে ইন্টারেট। এর প্রভাব হতে পারে তীব্র, রাজনীতিগত ভাবেও, যা চিরকালীন ভাষার রাজনীতি। সম্প্রতি ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিতে শুরু হওয়া একটি গবেষণা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেছে এই ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৈষম্যকে, যে বৈষম্য কিন্তু রেয়াত করে না পরিসংখ্যানকে। মানবসভ্যতা যবে থেকে ভাষা আউড়ে মান-অভিমান, ঝগড়া, বিক্ষোভ, হিংসা, হতাশা জানাতে শিখেছে, সেই লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাসে ভাষার সংখ্যা তো কম নয়। এর মধ্যে মাত্র কয়টি ভাষা আন্তর্জাতিক পরিসর তৈরী করতে পেরেছে? ডেভিড খ্রিস্টাল বলছেন, “Why a language becomes a global language has little to do with the number of people who speak it. It has much more to do with who those speakers are.” ভাষার ক্ষেত্রে একধরণের এলিটিজম কিন্তু বহু যুগ ধরে বহমান হতে হতেই প্রায় বিলুপ্ত করে দিয়েছে অন্য বহু ভাষাকে। আবার একটি ভাষা যে লুপ্ত না হয়েও কেমন মারা যেতে পারে, সেকথার প্রস্তাবনা যেমন রেখেছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। এই দুই ধরণের ধ্বংসের পিছনের রাজনীতিকেই চিনে নেওয়াটা ভীষণ প্রয়োজনীয়, এই ইতিহাসের অন্যথা করতে গেলে। গবেষণাপত্রটি এই উত্তরের সন্ধানে দেখেছে উইকিপিডিয়ার অনুবাদের গতিপ্রকৃতি, যেখানে, একটা চক্রাকার মডেল খুব স্পষ্ট। এই চক্রের কেন্দ্রে রয়েছে ইংরাজি – আর কক্ষপথে অবস্থান করছে জার্মান, ফ্রেঞ্চ এবং স্প্যানিশ। উল্টোদিকে পরিসংখ্যানগত ভাবে প্রবল জনপ্রিয় ভাষা কিন্তু চীনা, আরবী অথবা হিন্দিও। অথচ ওই গ্লোবাল পরিসরটুকু সেখানে তৈরী হচ্ছে না। কাজেই এই চক্রবুহ কে ভেঙে যদি বেরোতে হয়, তাহলে এর একটা বিকল্প মডেল খাড়া করে তোলা একান্ত প্রয়োজনীয়। সেই দায়িত্ব অবশ্যই আমাদের, আর এই ক্ষেত্রে ইন্টারনেটকে সদর্থক ভূমিকা নিতে হবে। আঞ্চলিক ভাষা থেকে আঞ্চলিকে অনুবাদের পরিসর তৈরী করে দেওয়া আজ শুধুমাত্র একটা প্রযুক্তিগত সাফল্যই নয়, ভাষাকেন্দ্রিক এই চিরাচরিত রাজনীতির প্রতিরোধের রাস্তার একটা মাইলফলকও বটে। আজ যত বিশ্বাসের সাথে উচ্চারণ করছি যে ইন্টারনেটের ক্ষমতা আছে সেই পরিসর তৈরী করে দেওয়ার যেখানে ভাষার পরিচয় কেবলমাত্র সেই ভাষাকে জন্ম দেওয়া মনুষ্যের শ্রেণী অবস্থান দিয়ে হবে না, বরং এই বৈষম্যের নিপাত ঘটবে। ঠিক ততটাই সচেতনতা নিয়ে চিনে নিতে হবে এই ক্ষমতার অন্ধকার দিকটাকেও – যেখানে ইন্টারনেটের এই দাপটে কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে ক্রমেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে অনেক ভাষা। যদি না অবিলম্বে প্রযুক্তি আর ব্যক্তিমানুষের জেদের সবটুকুকে কাজে লাগিয়ে তৈরী করে ফেলা যায় সেই পরিসর, যেখানে সকল ভাষার এই অধিকারটুকু থাকবে তার জাতি, অঞ্চল এবং যাবতীয় পাঁচিলকে পেরিয়ে নিজেদের বিস্ত্রৃত করার।

 

প্রযুক্তির দিক থেকে দেখতে গেলে এই কর্মসূচীকে বাস্তবায়িত করা নিশ্চয় সহজ কথা নয়। কতগুলো ভাষাকেই বা এখনোও পর্যন্ত কম্পিউটারে স্বচ্ছন্দে লেখা এবং পড়ার সুবিধা দিয়ে ওঠা গেছে? কিন্তু যতটুকু পারা গেছে সে পরিসংখ্যানও নেহাত কম নয়। আরও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তার অনেকটাই এখনোও হয়তো স্বপ্ন। যেরকমটা থাকে শুরুতে, কিন্তু তাও তো বদল হয়, অনুবাদও।

 

লেখাটি প্রাথমিক ভাবে “আলোচোনাচক্র” নামক লিটিল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় । 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *