গ্রিক ট্র্যাজেডি

শেষপর্যন্ত যা পড়ে ছিলো তার এক ভাগ প্রাণ আর বাকি তিন ভাগ লাশ।

 

কিন্তু প্রাণীদের মধ্যে অনেককেই দেখতে ছিল অবিকল তাদের লাশের মত, আর কিছু লাশের মুখের দিকে তাকালে মনে হতো এখনই স্লোগান দিয়ে উঠবে। অন্য কিছু লাশের নাড়ি ভুড়ি আর এঁটোকাঁটা বাকি ছিলো – তাদের চামড়া থেকে উত্কৃষ্ট চাবুক তৈরী হয়েছে। কিছু লাশ বড় দগ্ধ হয়েছে মরণে, তাদের চামড়াগুলো নষ্ট হয়েছে, কাজে লাগানো যায়নি। তবে কিছু মুন্ডু খুব ত্যাদড় গোছের , প্রাণ থাকতে এইগুলোই ভয় পায়নি তাই গলা থেকে কাটা হয়েছিলো, এখন ধড় না থাকতেও মগজ গুলোকে কব্জা করা যাচ্ছেনা। কিছু ধড় আবার দারুণ ডাগর – তাদের মুড়োগুলোকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি প্রাণীকূল। এদেরমধ্যে কমরেড শ্রুতির লাশটা বিশেষ মন দিয়ে দেখেছি। একতাল মাংস থেকে রীতিমত ভাস্কর্য করে বের করে আনতে হবে একটা পরিণত নারী শরীর। কিন্তু সেসব আমরা দেশপ্রিয় পার্কে করব না হয়, শ্রুতিকে পুনরায় শরীর দিলে শ্রুতি রাইফেল ধরবে, আর আমাদের আখাম্বা পুতুলটি ধরবেন ত্রিশূল কিংবা পদ্ম। ত্রিশূল ন্যাশনাল তরবারি তাই প্রাণীকূলকে অভয় দেবে, আর পদ্ম তো সরকারি পুষ্প বিশেষ। শুধু ভাসানের সময় ত্রিনয়নাকে যত অসহায় লাগে, তেলেঙ্গানার এই চোখ খুবলে নেওয়া লাশ ছিলো ততোধিক অপরাজেয়। আর  প্রাণীরা অনুভব করেছিলো, এই জন্যই মেয়েছেলেদের দেবী বানিয়ে রেখে দিতে হয়, কদাচ প্রাণসঞ্চার করতে নেই।

 

খালি কিছু লাশের ঠোঁট তখনও আধখোলা, তারা স্লোগান খুঁজছিলো; আর কিছু প্রাণকে দেখাচ্ছিলো অবিকল লাশের মতন। যেমন সিপিএম-কে দেখতে হয়েছিলো ভালো তৃণমুলের মত আর তৃণমুল শেষ অবধি খারাপ সিপিএম।

 

সাদা নয়, কালো নয়,  শেষপর্যন্ত  যা পড়ে ছিলো তার বেশিরভাগই ধূসর। কেবল একজন ত্রিশূলবিদ্ধ প্রাণ লাশ হতে হতে ঘোষণা করেছিলো, আমাদের সত্যি বলতে আছে শুধু গ্রিক ট্র্যাজেডিটুকু, আর জাগিয়ে তোলবার জন্য আছে গোটা দুনিয়া!

মেটামরফসিস

Metamorphosis by Sambaran Das
“Metamorphosis” by Sambaran Das

 

তীব্রতম ভালোবাসার শেষে দেখেছি কোমর থেকে পা অবধি জড়িয়ে যেতে থাকে। অল্প কাঁপুনি তখনও লেগে থাকে চামড়ায়, খুলে রাখা পালক জড়িয়ে নিতে নিতে মনে হয় এবারে প্রয়োজন ফুরোবে, ক্রমশ, আচ্ছাদনের। পা দুটোকে পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, ওদের আলাদা করা যাবেনা কাল ভোর থেকে, ওরা আপ্রাণ জড়িয়ে এক হয়ে উঠবে ঠিক। ছোটো ছোটো অাঁশ ঘন হয়ে ঘিরে ধরবে ওদের, প্রথমে পায়ের কাছ থেকে, একান্ত অভিভাবকের মত জানাবে, জানাবে গাড়ির জানলার কাচ থেকে দেখা একজোড়া চোখ, সে চোখের লিঙ্গ নির্ধারণ করতে না পেরে তাকে টিটকিরি দিয়েছে শহরের রাস্তা আর দামী গাড়ির দামী পারফিউম, কিন্তু সে বলেছে, না! সে বলেছে মানুষ বলে মনে করিস না, ওই টাকা আমি ছোঁব না; জানাবে আমাদের পাশের বস্তির সুমিত্রার নাম, সুমিত্রা বারো বছর বয়সে প্রথম যৌনতা করে ওর দাদার সঙ্গে, সেই বছরই তার কয়েক মাস আগে সুমিত্রার প্রথম “শরীর খারাপ” হয়; জানাবে ওয়ারসান শায়ারের পদ্যের যুবতীদের কথা যারা প্রায় সকলেই ধর্ষিতা কখনও দেশের কাছে, কখনও বিদেশী মিলিটারির কাছে; আমার দেশের দলিত মেয়েটির কথা জানাবে যাকে উলঙ্গ করে বেধড়ক আঘাত করা হলো সেইদিন, পেচ্ছাপ গেলানো হলো হইহই করে; জানাবে দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে ঠাণ্ডা পোহাতে পোহাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো ফুটফুটে মেয়েটা, আর ঘুম থেকে উঠে বুঝেছিল মরে গিয়েছে; জানাবে আর ভয় দেখাবে আর বিদ্ধ করবে। তারপর পা বেয়ে অাঁশের স্রোত ক্রমশ উঠে আসবে কোমরে, জাপটে ধরবে বলিষ্ঠ জাওয়ানরা যেভাবে তাদের বন্দুককে জড়িয়ে ধরে, পরম ভরসা দিয়ে জানাবে যেভাবে ছোটোবেলায় আম্মা জানাত পৌরাণিক মৎসকন্যাদের কথা যারা অপরূপ সুন্দরী কিন্তু তাদের কেউ ছুঁতে পায় না; জানাবে নিরাপত্তা, জানাবে কাফকা, জানাবে মেটামরফসিস।

এরপর থেকে ঢেউখেলানো চুল হবে, টানাটানা চোখ হবে, গমের মত রঙ হবে, কিন্তু  মৈথুন অসমম্ভব হবে, এরপর থেকে চেয়ারে বসা হবে না। নিতান্ত প্লেটোনিক প্রেমালাপের সময়ও আমার অবস্থান হবে একটা জল ভর্তি বিচিত্র গন্ধের আকুয়ারিয়ামে। এরপর থেকে একটা জলজ্যান্ত দেহ বদলে যাবে। ভাগ হবে। এরপর শুধুই সাঁতার অথবা ভেসে থাকা। ডুবে যাওয়ার অধিকারটুকু থাকবে না। একদিন হাঁপিয়ে উঠব, কারণ যন্ত্রের ভুল ত্রুটি হয় মানুষের মতই, অক্সিজেনের অভাবে সেদিন ভেঙে বেরোতে হবে কাচের জার – কোনওদিন যা ভাঙতে শিখিনি আগে। তারপর পেরিয়ে যাবো, ছুটে পালাবো পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিমে, সমাজতন্ত্রে আমার বিশ্বাস ছিলো প্রিয় কমরেড, কিন্তু, কিন্তু পাঁচিলের ওই পারে আমার দুটো পা ছিলো, কোমরের ওইপারে, কমরেড! গুলি করবেন না পিছন ফিরলেই, আমি এমনিতেই এই জল থেকে ঝাঁপ দিলে মারা যাব। আমি নিরাপত্তাকে অস্বীকার করছি অক্সিজেনের লোভে, সাম্যকে ত্যাগ করছি দামী লিপস্টিকের লোভে, আর, আর ওই দুটো পায়ের লোভে। আমি মারা যাবো এই পলায়নেই, দেখে নেবেন, কমরেড, আপনার একটি গুলিও খরচা হবে না।

আজকাল প্রায়সই একটা স্বপ্ন দেখি অধোঘুমে। একটা বাড়ি, প্রায় প্রাগৈতিহাসিক তার বয়স। তার দিকে ছুটছি, ছুটেই চলেছি, কিন্তু স্পষ্ট করে জানিনা কেনো পালাচ্ছি অথবা আদৌ পালাচ্ছি কিনা; কিন্তু কেউ বলে দিয়েছেন একটা সিঁড়ির কথা, একটা দীর্ঘ সিঁড়ি যার আদলটা ইউরোপিয়ান কিন্তু মালিন্যে নিকট-আত্মীয়ের মত, বলে দিয়েছেন সেই সিঁড়ির ধাপে পরিচয় হবে আমাতে আর তোমাতে। তুমি বলবে, জনগণের উদ্দেশ্যে তোমার বার্তা? আমি তখনও হাঁপাচ্ছি। তুমি বলবে, তোমার সফরের কথা বলো, যেখান থেকে এলে, যেখানে যাচ্ছ। আমি হাঁপাচ্ছি, হাঁপাতে হাঁপাতে বলছি: কিন্তু আমার সামনে কোনও পোডিয়াম দেবেন না প্লিজ, কিংবা কোনও উঁচু টেবিল, আজকাল পা দুটোকে চোখের আড়াল করতে পারিনা একদম। তুমি কারণ জানতে চাইবে না কারণ তুমি জানো, কারণ তুমিও বিপ্লবী অথবা ভিক্টিম। কারণ তুমিও পলাতক, তুমিও সাঁতরে পার হয়েছ ভূমধ্যসাগর, তোমার ঘরেও আগুন লেগেছে, তোমার দেশও নিভে গিয়েছে যুদ্ধে, তোমার কোমরেও গোপন আছে দাগ, তোমার সীমান্তের ওপারেও, মেটামরফসিস!

বাজেশিবপুরে নবারুণ

আমার বাবার ছোটকাকা ইস্কুলের কোনও এক হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষাটা ডুব মেরেছিলেন শুধুমাত্র এই বিশ্বাস নিয়েই, যে, বিপ্লব যখন এসেই যাচ্ছে তখন আর কিসের ইস্কুল, কী-ই বা পরীক্ষা। ৪৮-এর সেই গনগনে দিনকালে তখন উচ্চারিত হয়েছে, “ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়”, আমার ঠাকুরদা তখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য হিসেবে জেল খাটছেন। এরই মধ্যে ডাক উঠল জেলের পাঁচিল ভাঙার — অর্থাৎ বিপ্লব প্রায় বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ছে, এরপর কোন আহাম্মক শেরশাহের বিচারব্যাবস্থা সম্পর্কে টীকা লিখে কৈশোর নষ্ট করে! কিন্তু দোর খুলতেই দেখা গেলো, রক্তে বিপ্লবের মাত্রা যতখানি তুঙ্গে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতা ও জহরকোটের শুভ্রতায় তার প্রভাব ততখানি নয়। এইসব, সমস্তই, আমার শোনা কথা আর পড়া ছাপা অক্ষর থেকে। বেশ ছোটো থেকেই দাদাই, মানে আমার ঠাকুরদা, সাল উল্লেখ করে বেশ গুছিয়ে কত গল্প বলতেন মনে আছে। দারিদ্র্যের গল্প, যখন খেতে পাওয়া নিয়ে ভাবতে হয়েছে; তারপর জেলে থেকে অনসনের গল্প, যখন ৩৯ দিন খাদ্যকে অস্বীকার করেছেন। কি জানি, হয়তো সেই থেকেই কখনোও খুব ছোটো বয়সেও হাড় হিম করা সব ভুতের গল্প আমার কাছে বিশেষ রোমাঞ্চের ঠেকেনি। তবে এই সব গল্পের আড়ালে আমার প্রশ্নটা থেকেই যেত, তাহলে এবারেও বিপ্লবটা হলো না, ৪৮-এ না, ৬৭ তে না, ৭১-এও না? দাদাই বলেছে, “হবে।” আমার প্রশ্ন আমি উচ্চারণ করিনি কখনোওই, দাদাইয়ের উত্তরও ছিল সাংকেতিক। তাই অভ্যাস থেকেই বলছি, শুনে নিন, ৩০ জুলাই ২০১৫ তে বাজেশিবপুরে যুবক সমিতির কর্মকাণ্ড সংকেত দিয়েছে, “হবে”।

 

জুন মাসের মাঝামাঝি ঠিক করা হয়েছিলো, জুলাই মাসের ৩০ তারিখে নবারুণের উপর বানানো কিউয়ের ডকুমেন্টারির একটা স্ক্রিনিং ঘটবে হাওড়ার বাজেশিবপুরে যুবক সমিতি ক্লাবের ঘরে। হাওড়া এর আগে খুব পরিচিত ছিলো না আমার কাছে কখনোওই। কয়েক সপ্তাহ আগে তখন ৩০ তারিখের তোরজোড় সবে শুরু, হাওড়াও তখন থেকেই জানান দিতে শুরু করে। কিন্তু কি আশ্চর্য, বেশ কিছু সন্ধ্যেবেলা, বেশ কিছু গলিতেই আমার মনে হয়েছে যেন কোন এক সুত্র ধরে চেনা। এ ভারী মজার ব্যাপার, চন্দননগরের যে বস্তি অঞ্চলের সাথে মাখামাখি দিয়ে আমার বড় হয়ে ওঠা সেই ঝুপড়ি ঘর গুলোর অনেক গুলোতেই এখনোও সহজ পাঠও প্রবেশ করেনি, ইলেক্ট্রিসিটিই ঢুকেছে এই হালে। সুতরাং নবারুণ ভট্টাচার্য ও তার উপস্থিতি সেখানে ভীষণই অকিঞ্চিৎকর এক ঘটনা। কিন্তু ক্লাস সিক্স কি সেভেনে যখন পড়ছি, তখন হার্বাট হাতে নিয়ে দেখলাম অদ্ভুত চেনা চেনা ঠেকছে। বস্তুতই আমার জ্ঞানে ততদিনে যেটুকু খিস্তির সমারহ সমস্তই ইমিডয়েট পারিপার্শ্বিক থেকে যত্নে ও অযত্নে সংগৃহীত। এই নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, তবে যেটুকু বলার, আমি নবারুণ কে চিনেছি এই চারপাশ দিয়ে, আর এই যে এতদিনের চেনা চারপাশটাকে নতুন করে আরও আরও আবিষ্কার করতে শিখেছিলাম নবারুণকে দিয়ে। আর হাওড়ার অলি গলি চিনতে শুরু করেছি খানিকটা এই এত দিনের চিনতে পারার অভ্যাস দিয়ে।

 

ঠিক হল, ছবিটা দেখানোর সাথে সাথেই কিছু আরও কর্মসূচী নেওয়া হবে। সম্বরণ দেওয়ালে লিখবে নবারুণের কথা, কাব্য ও আরোও নানা বিস্ফোরক। ল্যাম্পপোস্টের মাথায় লাগানো হবে চোঙা আর তাতে নবারুণের কন্ঠ বলে চলবে কবিতাগুলো, এক-একটা বাড়ির দেওয়ালে প্রোজেকশন করে দেখানো হতে থাকবে বিভিন্ন স্টিল ছবি, ভিডিও লুপ। একটা বেশ বুথ তৈরী হবে, বেবি কে’র বুথ, একটা টেবিলের এক কোনায় রাখা থাকবে এক বোতল পেট্রল আর বাংলা। আর টেবিলের উপর থাকবে ল্যাপটপ, হেডসেট দিয়ে শোনা যাবে বেবি কে’র কিছু অংশ পাঠ করেছেন জয়রাজ আর সুরজিত। আর থাকবে পোষ্টার, মন্দিরতলা থেকে যুবক সমিতি আসার রাস্তাটা আমরা ঠিক করলাম ভরিয়ে দেবো পোষ্টারে আর এন্যারকিস্ট ফ্ল্যাগে! ডিজাইন করবেন দেবিকা দাভে; গোল চশমা পড়া মেয়েটা বড় হয়েছে কিন্তু দিল্লিতে আর কলেজ ব্যাঙ্গালোরে, বাংলা জানে না। অথচ ২৮ তারিখ রিক্সায় আসতে আসতে আমাকে বলল, “এই যে কেমন দেখ একটা পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া বাড়িটার পাশে একটা চকচকে ফ্ল্যাট, এইটা দেখতে পাবো না বলেই বোধহয় আর ব্যাঙ্গালোরে ফেরা গেলো না।”

 

যুবক সমিতি বলে কোনও পাড়ার ক্লাবে একটা ছবির স্ক্রিনিং হচ্ছে এরম কথা আর কেই বা কত শুনেছে। তেমনি আমি নিজেও যে “যুবক সমিতি”তে ব্যক্তিগতভাবে এত সময় কাটাবো এটাও একটা চমক এই নারীবাদী মেরুদণ্ডের কাছে। ২৯’এ আমি যখন হাওড়া গেলাম, গিয়ে দেখলাম গুচ্ছ পোষ্টার লাগানো হয়ে গিয়েছে, পছন্দের দেওয়ালগুলোতে চুনকাম শেষ, আর সম্বরণ বৃষ্টি মাথায় করেই কত দেওয়াল লিখে ফেলেছে অনেকটাই। ওই গলিটা দিয়ে তো আগেও ঢুকছি, ওই চায়ের দোকানের সামনেও যে আগে দাঁড়াইনি এমন তো নয়, কিন্তু তখন সামনের দেওয়াল জুড়ে লেখা থাকতো না, “ভীতু মানুষের পাশ থেকে যে কবিতা সরে যায়, সেই কবিতা আসলে ভীতু।” মাঝে মাঝে যেমন মনে হয়, রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ বেশ একটা মানানসই  ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর দরকার ছিলো জীবনে, এইদিন চা-টা হাতে নিয়ে সামনে তাকিয়ে ওই দেওয়ালটা দেখে ঠিক উল্টো মনে হচ্ছিল। মনে হলো, সব শব্দ আর আওয়াজ আর কোলাহল কিছুক্ষণের জন্য নেই, খালি দেওয়াল জুড়ে আছে অক্ষর অনেক যত্নে লেখা, আর তাকে ঘিরে পোষ্টার, এনার্কির A কে জড়িয়ে আছে অর্ডারের O। ঠিক এই রকম নৈঃশব্দ্যই নেমে আসে বিস্ফোরণের আগে, ঠিক এই রকম নৈঃশব্দ্য দিয়েই তো আমার কমরেড বলে দেন, “হবে”।

 

দেওয়াল চুনকাম করে ফেলেছিলেন পাল দা, নোটন দা, প্ররেনাটারা মিলে রাত জেগে। জয়রাজ আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন বলে ক্লাবের এই মুখ গুলো কে আমি ও’র ডাকেই ডাকতে থাকি এই ক’দিন। যা মনে হচ্ছে এই রকমই চলবেও। পুরো নাম গুলো জানিনা, কোনোদিন জানবো অথবা জেনে খুব উদ্ধার হবে এমন সম্ভাবনাও দেখছি না। হাওড়ার এই গলির আনাচ কানাচ থেকে আত্মীয়তা গজায়, এ কথা আমি একটুও বাড়িয়ে বলছিনা। শুধুমাত্র আত্মিক যোগ দিয়েও বৃষ্টিকে এইভাবে রুখে দিয়ে সারা রাস্তার প্রায় সমস্ত দেওয়াল পোষ্টারে ভরে দেওয়া যায় না, আগের রাতটা প্রায় জেগে প্রোজেকশনের সমস্ত ব্যবস্থাটুকু অবধি অক্লান্ত খেটে যাওয়া যায় না। কমিটমেন্ট প্রয়োজন, তা রাজনীতিরই হোক অথবা বন্ধুত্বের।

 

তমোঘ্ন ২৯ তারিখ জানালেন ও একটা পারফর্মেন্স কন্ট্রিবিউট করতে চায় এই ব্যবস্থায়। পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এর নব কর্ণধার নিযুক্ত হয়েছেন গজেন্দ্র চৌহান, এই নিয়োগের পিছনে ভারত সরকারের যাবতীয় যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চলেছে ছাত্র ছাত্রীরা আজ বহুদিন হয়ে গেলো। অথচ, ভারতীয় জনতা পার্টি তথা মোদী সরকার মেজরিটির দোহাই দিয়ে চাপিয়েই দিয়ে চলেছেন একের পর এক ঘটনা দেশের উপর। চৌহান তার একটা উদাহরণ, এবং যথেষ্ট এলার্মিং-ও বটে। ৩০ তারিখ বিকেল ৫:৩০ থেকে তমোঘ্নোর পোষাক বলতে ছিল গেরুয়া রঙের স্কার্ট সদৃশ যে কাপড়টা তার তিনটে অংশে আনন্দবাজারও বিরাজ করছে। তমোঘ্নর হাতে ছিল একটা বোর্ড যাতে লেখা, বড় বড় অক্ষরে, “Kick my ass” — তমোঘ্ন লাথি দাবী করছিলেন উপস্থিত ক্রাউডের কাছে গিয়ে, একেক জনের কাছ থেকে, আর লাথিটা পড়ছিলো আনন্দবাজারে, গেরুয়ায়, স্বৈরতন্ত্রে, স্বেচ্ছাচারীতায়, আর আমাদের কাপুরুষতায়।

 

ছবিটা দেখানো হয়েছিলো সেদিন। সেদিন হাওড়ার অলিগলি থেকে শোনা গিয়েছিলো, “এখনই কবিতা লেখা যায়”, গলির বাঁকে যে বাড়ির দেওয়াল এতদিন গ্রাহ্য করার প্রয়োজন পড়েনি, তাতেই ফুটে উঠেছিলো নবারুণের ছবি, নবারুণ হাসছেন, অসম্ভব সাংকেতিক সেই হাসি। অভ্যাস থেকেই বলছি, বিশ্বাস করুন, নবারুণ বলেছেন, “হবে”।
লেখাটি প্রাথমিক ভাবে “বাংলাব্ল্যাক” নামক আর্কাইভ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় ২৮ আগস্ট, ২০১৫ তে ।

শূন্যস্থান

সমস্ত স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত শিশুর জীবনের মত আমার ছোটোবেলাও ছিলো চমৎকার সব মিথ্যে দিয়ে ভরা। আমার বাপ মা ঝগড়া করেছে ঠিকই, সন্ধ্যের দিকে ভাবও করে নিয়েছে ঝটপট। আমার ঠাকুমা, মানে আমি আম্মা ডাকি, গল্প বলে ঘুম পাড়িয়েছে রাতের পর রাত; দাদাই মানে ঠাকুরদাদা আমার, তিনি ছিলেন যেমন বটবৃক্ষের মত স্থির তেমন পরিমাণ মত ভুঁড়িও ছিলো বেশ; চন্দননগরের বাড়িতে পার্টির মিটিং হত, সেইসব ঘরে কাপের পর কাপ চা যেত আর ঘর থেকে বাইরে আসত শব্দ, সময়ের শব্দ, দেশ-কাল-সময়ের শব্দ, আর দাদাই তখন কী গম্ভীর, কিন্তু রাত্তির হলে আমাকে পিঠে চাপিয়ে বাবা মার ঘর অবধি দিয়ে আসত এই পুরুষই। আমি স্কুলের পরীক্ষায় টপাটপ ফার্স্ট হতাম আর নাচ শিখতাম আর গান গাইতাম আর বই পড়তাম। যদিও আমি চন্দননগরে বড় হইনি, তবে যে বাড়িতে আমার ছোটবেলার মস্ত সময় কাটে সেখানে বই ছিলো হাজার দশেক, আর চন্দননগরে তো আরও অনেক বেশি। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে পিযুষকান্তি ছিলো টেপরেকর্ডারে আর কাঠের হোমিওপ্যাথির বাক্সে লাইন দিয়ে অধিষ্ঠান করত নাক্সভোমিকা, কার্বোভেজ, আর্নিকা, প্রমুখ। লোডশেডিং-এ বারান্দায় বসে বাবার সাথে গান গাইতাম, মা ভালো কেক বানাত। জন্মদিনে বিস্তর লোক পোলাও খেতো। সাইকেল চালাতাম, উদ্দাম আছাড় খেতাম, লাল ওষুধ ছিলো হাঁটু জুড়ে। বাড়ির পিছনে খেলার মাঠ ছিলো, বাড়িতে বারান্দা ছিলো। মাঠে খেলতে আসত একজোড়া চোখ, গান গাওয়ার সময় যে চোখগুলো বুজে আসত, দেখতাম। তখন প্রথম চাপ ছিলো। মানে যেরকম হয়। এক্কেবারে যেরকমটা হয়ে থাকে আর কি। এই গোত্রের ছোটোবেলাতে বিচ্ছেদ থাকে না, মানুষেরা সব বেঁচে থাকে আর সব পরীক্ষা ভালো হয়। বেঁচে থাকাটা যে মোটের ওপর ফুর্তির ব্যাপার এই নিয়ে কোনও সন্দেহই প্রায় থাকে না।

তবে আমি কখনোওই পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি।  প্রথম খটকা আমার লেগেছিলো বাংলা কোয়েশ্চেন পেপারে। যখন দেখলাম নানাবিধ প্রশ্নপত্র জুড়ে আনাচে কানাচে সব ‘ড্যাশ’ আর মোটামোটা অক্ষরে লেখা থাকছে: শূন্যস্থান পূরণ কর। মনে মনে আওড়ালে হুমকির মত শোনাতো। তখন নম্বরের লোভে ঝুপঝাপ শব্দ বসিয়ে কেল্লা ফতে হতো ঠিকই, কিন্তু, মনে হতো এখানেই শেষ নয়। প্রথম শূন্যস্থানের প্র‍্যাকটিকাল হলো রূপালী মিস মরে গেল যেদিন। রূপালি মিস কম্পিউটারের মিস। বাসে যেতে যেতে বাইরে হাত বার করেছিলো নাকি, ডান হাত, লরির সাথে ধাক্কায় কেটে বেরিয়ে গেছিলো। খবরটা দিয়েছিলো কি মা? মনে নেই স্পষ্ট। মনে আছে কেউ বলছিলো, রূপালী মিস ঘটনার পর ওর দাদাকে দেখে প্রথম বলে, “দাদা রে, এবার বাঁ হাত দিয়ে কম্পিউটারটা অভ্যাস করতে হবে।” আমার এটা শুনে এখনও মনে হয়, এটা বলার সময় উনি হাসছিলেন। রূপালি মিস সবসময় হাসতেন। তবে বাঁচানোই যায়নি আর। দুটো হাত, পা, ধারালো ব্রেন, ওই হাসিটা, কোনওটাকেই বাঁচানো যায়নি। রূপালি মিসের শূন্যস্থান পূরণ করতে এসেছিল যে তার নাম মনে নেই। কিন্তু মনে আছে সেদিন থেকে শূন্যস্থানের আকার পাল্টালো জীবনে, কোয়েশ্চেন পেপারের ড্যাশগুলো রাতারাতি চেহারা পাল্টে একটা জ্যান্ত পূর্ণাঙ্গ মানুষের মত দেখতে হলো।

তারপর? তারপরও যেরকম হয়। দাদাই বুড়ো হয়ে যায় আর সাম্যবাদেরও বয়স হয়ে গেলো। দাদাই প্রথমে ছাড়ল সাইকেল তারপর রাজনীতি। আম্মা পুরোনো গল্পই বারবার বলতে লাগলো। বাড়ির পিছনের মাঠ আর বারান্দা আর সবুজ টাউনশিপ ছেড়ে আমরা পাকাপাকি এলাম চন্দননগরে।  এইসবে অনেকদিন কেটে গিয়েছে যখন তখন একদিন বুঝলাম শূন্যস্থানটাকে অবিকল ছোটোবেলার মত দেখতে হয়ে গিয়েছে কখন, টেরই পাইনি।

এইসমস্ত গল্পের বাহারে যার নাম বলছিনা, এড়িয়ে যাচ্ছি, আর ভাবছি এইবার বলেই দি কিন্তু পিছিয়ে যাচ্ছি, তাকে নিয়ে লিখব বলেই এই লেখা ফাঁদা।  তাকেও, তাকেও বাঁচানো যায়নি রূপালি মিস আর ছোটোবেলার মত। জ্যান্ত মানুষদের প্রয়োজন পড়লেও সচরাচর আমি সর্বনামেই ডাকি। কিন্তু ছ-ফুট-এক-ইঞ্চির শূন্যস্থানকে কি বলে ডাকতে হয় আমি বুঝিনি এই বছর চারেকে।

মরা মানুষ, প্রিয় মানুষ তোমাকে বলছি, এবারেও পারলাম না, দেখো? মৃত্যুকে লিখতে আমি এখনও শিখিনি। তবু কখনোও, কোনওদিন, শুধু তোমাকে নিয়েই লিখব ঠিক, একটুও ধানাইপানাই না করেই। তোমার তুবড়ির মশলার রসায়ন ফাঁস করে দেব সেইদিন, তোমার প্রিয় গান, প্রিয় কাটলেট, প্রিয় রঙ, প্রিয় বেড়াল, প্রিয় টিভি চ্যানেল, প্রিয় ঘর, প্রিয় মানুষ, সব সব লিখে দেব একদিন। কোনও এক সাতই জুলাই। কোনও এক সাতই জুলাই আমরা বাঁচাতে পারবো তোমাকে।

ততদিন, শূন্যস্থান, ভালো থেকো। অপূর্ণ থেকো।

একটি উত্তর আধুনিক সামাজিক পালা

সততা অতি বিষম বস্তু, যা দস্তুরমত সর্বনেশে। সে মাল এমনই সুন্দর যে ভয় করে। আর এ তো শুধু আজকের কথা নয়, কত ঠেকেছি, কত শিখেছি, এভোল্যুশনের অকল্যাণে এই তথ্য এখন আমাদের মগজে জিনগত বিদ্যের মত গাঁথা। তবুও তো রোজ সন্ধ্যের দিকে কত ফ্যাকাশে মুখ মেট্রো স্টেশনের একটা কোনা থেকে থার্ড রেল দেখে: জ্বলজ্বলে কঙ্কালের ডেঞ্জারবাণীর উল্টোদিকেই সুযোগ, ভীষণ সাহস দিয়ে গড়ব পরের চান্সে! ভাবে, পরের দানে, সোচ্চারে জানাবে বসের মূর্খামির কথা, মাসতুতো দাদার সাথে অন্যায় সম্পর্ক লুকোবে না কিছুতেই, অকপটে বলে দেবে সে কেমন কাফকাও পড়ে আর করণ জোহরও দেখে, ইংরিজি বলতে গেলে ফাটে, অথবা কতবার মনে মনে মৃত্যুকামনা করেছে নিজের শরীর নিঃসৃত ১২ বছরের অটিস্টিক জড়বস্তুটার! সততা তাই কখনও হয় নেশাদ্রব্যের মত, সমাজের যাবতীয় ডাবল স্ট্যান্ডার্ডস থেকে কিছুক্ষণের ছুটি নিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন। কখনও আবার হয়ত আত্মঘাতী বোমা; অথবা নিছক পেপার স্প্রে, এক বোতল সাহস! সত্যির কথা বলছিনা, তার পরম সত্ত্বা তো অধরা; কিন্তু সততা, সে যে কি ব্যাথাজাগানো সুন্দর তারই একপ্রকার ডেমো হল একটি উত্তর আধুনিক সামাজিক পালা। থিয়েটার ফরমেশন পরিবর্তকের একটা সৎ এবং নির্লজ্জ কাণ্ড।

 

আমি একে নাটক বলব কেবলমাত্র শব্দের দীনতার কারণে। পর্দা ওঠার আগে ওপাশ থেকে যে সুর ভেসে আসে, তাকে গান বললে কম বলা হয়, হুমকি টুমকি বলা যেতে পারে। স্ক্রিন নামানো, স্টেজের মানুষেরা তখনও অচেনা, শুধু তাদের কন্ঠগুলো ফুটছে, ফুটে উঠছে যে সুরে, পর্দা ভেদ করে তা দর্শকে ছড়াচ্ছে। সুর তো ছোঁয়াচে, বিপ্লবের মতই; স্টেজের তখনও হদিস অবধি নেই অথচ সমস্ত প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে যেন নিখুঁতভাবে রটে যাচ্ছে যে পরবর্তী ঘন্টাখানেক আর যাই হোক শান্তি দেবে না! স্টেজ জুড়ে এরপর তুমুল দাপটের সাথে উচ্চারিত হয়েছে একের পর এক সময়ের কথা, সময়বাহিত একটার পর একটা চরিত্রের কথা, কাউকে হয়ত আমরা নাম দিয়ে চিনি, কাউকে জীবন দিয়ে। মেয়েরহল্ড থেকে কার্ল মার্ক্স্ থেকে মমতা ব্যানার্জী থেকে মনীশ মিত্র – প্রত্যেকে স্বনামে, স্বমহিমায় এবং স্ব-কীর্তিতে এই মঞ্চের অংশ হয়েছেন এবং বরাদ্দ থাপ্পরটুকু খেয়েছেন। এরকমই এক দৃশ্যে এক চরিত্র যখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা বাক্য আউড়াতে গিয়ে হোচট খাচ্ছে বিশেষ্য ও বিশেষণের প্রয়োগ নিয়ে তখন খেয়াল হল এই মঞ্চে যেটা ঘটছে সেটা আসলে একরাশ বক্তব্য, সময়ই বলেছে যেসব কথা, ব্যাকরণের পরয়া না করেই যেখানে সেখানে বেনিযমে ছুড়ে দিয়েছে প্রশ্নচিন্হ। থিয়েটার ফরমেশন পরিবর্তকের এই কীর্তি কোনো একটা ঘটনার কথা বলে না, বদলে অনেক বিছিন্ন ঘটনা মনে করায়, আর ঘাড় ধরে দেখতে বাধ্য করে যে এই ঢাউস মানবসভত্যায় সামান্যই বিছিন্ন।  বোঝা যায় মানুষে মানুষে পার্থক্য অল্পই; চরিত্র বদলে বদলে তারা একসময় থেকে অন্যসময়ে দেখা দেয়, কিন্তু মিলে যায় সাহসে, প্রেমে, রামে অথবা হারামে। মাতঙ্গিনী হয়ে যায় লক্ষ্মীবাঈ; ভাই-বোন হয়ে যায় প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা স্বামী-স্ত্রী।

 

বস্টনের রাস্তায় একবার একটা বইয়ের ঠেলাগাড়ি দেখেছিলাম মনে আছে। রাস্তার ধরে দাঁড়িয়ে ছিল একা একগাদা দামী দামী ঝলমলে বই নিয়ে, যাদের অধিকাংশই পুরোনো বই; কিন্তু চারপাশে কোথাও কোনও মানুষ নেই পাহারায়। আছে একটা বাক্স যাতে বলা আছে বেচা-কেনার পুরো মাধ্যমটাই অনর সিস্টেমে (Honor System), বইগুলোর সামান্য কিছু দাম নির্ধারণ করে লেখা আছে কভারে, এরপর পছন্দ হলে নিজে থেকেই ওই বাক্সে যেমন মনে হবে তা রেখে যেতে। এইরকম নাকি চলে আসছে ২০০৬ থেকে। বাক্সের গায়ে কালো রঙের হরফে লেখা ছিল লংফেলোর একটা কথা, “I have an affection for a great city. I feel safe in the neighbourhood of man, and enjoy the sweet security of the streets.”  একাডেমীতে এই  নাটকের টিকিটের কোনও নির্ধারিত মূল্য ছিল না। দর্শক নিজের থেকে যে দাম দিতে ইচ্ছে করবেন টিকিট কাউন্টার থেকে সেই মূল্যের বিনিময়েই টিকিট পাবেন, এমনি নিয়ম। আমার খুব মনে পড়ছিল ওই ঠেলাগাড়িটার  কথা, সেদিন তো ওই বাক্সটার  দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম কতকিছু, ভেবেছিলাম এই যে বিশ্বাসটুকু নিয়ে ঠেলাটা দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় এক দশক ধরে এও কি একধরনের প্রথম বিশ্বসুলভ বিপ্লব? এই বিশ্বাস করতে পারাটাও কি একধরনের প্রিভিলেজ যার মেরুদন্ডে রয়েছে একটা বিরাট অংশের মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা? তারপর কতদিন কেটে গেছে, শুধু এইদিন নাটকের টিকিটটা হাতে নিয়ে মনে হচ্ছিল, সাহসের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ; বিশ্বাসের উপর সাহস হারানোও বোধহয় কোনো কাজের কথা না। এই নাটক সেই অর্থে সবার – যারা অভিনয় করেছেন, গান গেয়েছেন, আলো ফেলেছেন, মঞ্চ সাজিয়েছেন তারা যেমন আছেন – দর্শকও কিন্তু ততটাই রয়েছেন। তিনি এই ব্যবস্থায় আর ক্ষমতাহীন বিনোদনখেকো প্রজাতির একজন নন; তিনি দেখছেন, শুনছেন, হাসছেন, রেগে উঠছেন, আবার দামটাও অনুভব থেকে নির্ধারণের দায়িত্ব তারই উপর। যেকোনো কোলাবরেটিভ আর্ট ফর্মের একটা বিশাল বড় উপায় হল গিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস। জীবনেও যেমন। এই দলটি বিশ্বাস করেছে তেমন কত অচেনা মানুষকে, এই বিশ্বাসের জোরেই হয়ত নাটক চলাকালীন কারও মোবাইল ফোনও বাজেনি হলের কোনও প্রান্ত থেকেই। অথবা এটা একদম কাকতালীয়। কিন্তু সত্যিই বাজেনি। যেটুকু জানি, তাতে আর্থিক কারনেও এই নাটকের অনেক শো তেমন সম্ভব নয়। সত্যি বলতে কি, আমার যে তাতে বিশাল কোনও ব্যথা জাগছে তা নয়। কোনও অর্থেই এই পালাটি কালজয়ী মেটিরিয়াল নয়; সুখী বাঙালির তাতে অস্বস্তি হলেও, “জানিস খোকা আমাদের কিশোরবেলায় এই পালাটি যখন প্রথম দেখেছিলেম তখন রক্ত টগবগ ফুটেছিল, এখনও যতবার দেখি ততবার লোম খাড়া হয়, অতএব চল তোকেও দেখাতে নিয়ে যাই” স্বরূপ তৃপ্তি জোটার কোনও সিন নেই। যেমন নাটকের শেষ অংশে মনীশ মিত্রের চরিত্র এসে নাটক বন্ধ করতে বলছেন, ধমকাচ্ছেন, এবং পর্দা পড়ছে। বছর তিনেক বাদেও এর প্রাসঙ্গিকতা অল্পই থাকবে। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, এই একটি মিনিট দুয়েকের সিন কত মানুষের রাগের কথা তো বলছে।  তবে এরপেরই, শেষতম দৃশ্যে যখন নাটকের সকল মানুষ একসাথে গান গেয়ে বলে নতুন বাংলার স্বপ্নের কথা তখন ভারী আরাম হয়, ওই আবেগটুকু কিন্তু দেশ-কাল-সীমান্ত জয়ী এক ব্যাপার। বড় মিঠে সুর খানাও সেই গানের, কানে লেগে থাকে, আর একটু আধটু স্বপ্ন কানে লেগে থাকা ভালো। তবে আমার একরকম বোধ হল যে, নাটকে কারোরই আলাদা করে অভিনয়ের ক্ষমতা পরখের জায়গা বিশেষ নেই। নির্দেশনা ও রচনায় জয়রাজ হয়ত খানিক সচেতন ভাবেই এই নাটক গেঁথেছেন। যারা অভিনয় করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই যে  খুব অভ্যাসে নাটক করেন না সেকথা বোঝা যায়। কিন্তু তাতে এতটুকু বাধা পড়েনি আগুনে। বরং স্বাভাবিক লেগেছে, চেনা লেগেছে।

 

রোববারের আকাদেমির এহেন মঞ্চের কথা মনে করতে করতে হঠাত এখন মনে হচ্ছে, হয়ত একেই থিয়েটার বলব এবার থেকে অভ্যেস পাল্টে। যে থিয়েটার সমস্ত অর্থেই সব মানুষের থিয়েটার। যেখানে চরিত্র আমারই মত জামাকাপড় পরে হাত পা নেড়ে আমার কথাই বলছে। সেইসব কথাগুলো যেগুলো স্বীকার করতে গিয়ে, চেঁচিয়ে বলতে গিয়ে আমার শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে গুলির আওয়াজ শোনায়, হয়ত সরকারী চাকরিটা হাতছাড়া হয়, সংসার ভাঙে, বন্ধুরা ছেড়ে যায়। এরপর হয়ত নাটক দেখতে যাওয়াটা আর সুখী বিনোদন নয়। নাহলে চোখ বন্ধ করলেই কেন মনে হচ্ছে অন্ধকার মেট্রো স্টেশনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ, তাদের মুখগুলো কতদিন হলো কেউ দেখেনি, এমনকি মুখোশগুলোও ফ্যাকাশে — প্রত্যেকের চোখ সামনের পর্দার দিকে যা এখনও ওঠেনি, কেবল পর্দার ওপাশ থেকে সুর ভেসে আসছে আর মানুষ থেকে মানুষে রটে যাচ্ছে আজকের নাটকের বিষয়: তৃতীয় রেল — কতবার কতসময়ে যাকে যাবতীয় ভয় পেরিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়!

 

লেখাটি প্রাথমিক ভাবে “দেশের আগামীকাল” নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।